রাজনীতি, শিলিগুড়ি

‌বুথ ফেরত সমীক্ষায়‌ শিলিগুড়ির ফার্স্টবয় কে?‌

এপ্রিল 28, 2026

দুরন্ত প্রতিবেদন :‌ শিলিগুড়ি বিধানসভায় মোট প্রার্থীর সংখ্যা ১১ জন। তবে মূল লড়াইয়ে আছেন ৩ জন। তৃণমূলের গৌতম দেব, বিজেপির শংকর ঘোষ ও সিপিএমের শরদিন্দু চক্রবর্তী। কংগ্রেসের অলোক ধারা খুব বেশি ভোট টানতে পারবেন না। কংগ্রেস প্রার্থী নিজেও ভোটের জন্য কাঙাল নন। বরং শিলিগুড়ি নিয়ে তাঁর ভাবনা ও পরিকল্পনা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই ছিল অন্যতম উদ্দেশ্য। অবশেষে ২৩ এপ্রিল ভোট হয়েছে। ৮৮.‌৯৮ শতাংশ ভোট পড়েছে শিলিগুড়িতে। রেকর্ড ভোট পড়ায় বিরোধীদের আনন্দের সীমা নেই। বলা হয়, ভোট পড়ার হার বেশি হলে সেখানে নাকি প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা কাজ করে। ফলে তৃণমূল বিরোধী বিজেপির পক্ষেই বেশি ভোট পড়েছে বলে নিশ্চিত বিজেপি নেতারা। কিন্তু বাস্তবে কী হতে চলেছে, কে হবেন ভোটের শিলিগুড়ির ফার্স্টবয়?‌ তাই নিয়েই ভোট দিতে আসা মানুষের মতামত ও ভোটপরবর্তী বিভিন্ন দলের নেতাদের নিজস্ব হিসেব থেকে তথ্য নিয়ে এই রিপোর্ট তৈরি করা হল।

শঙ্কর ঘোষ

ভোটের লাইনে দাঁড়ানো খুব কম মানুষ বলেছেন ‘‌শঙ্কর ঘোষ জিতবেই’‌। বরং সকলেই বলেছেন ‘‌শিলিগুড়িতে এবার হাড্ডাহাড্ডি। তবে হাওয়া যা তাতে শঙ্কর বেরিয়ে যেতে পারে।’‌ কিন্তু ভোটের দু’‌দিন পর থেকে সব দলের তরফেই নেতাকর্মীরা বলছেন, যা আঁচ পাচ্ছি, তাতে শঙ্কর ঘোষই মনে হয় জিতে যাচ্ছে। শিলিগুড়ির ১, ৩, ৫, ১৮, ৪৬, ৮, ৯ নম্বর ওয়ার্ডে বিজয় মিছিল করাটাই যেন বাকি আছে। সেখানে প্রকাশ্যে বলা হচ্ছে শিলিগুড়ির ফার্স্টবয় আবারও শঙ্কর। শিলিগুড়ির একাংশ বিজেপি নেতা, হিন্দু সংগঠনের কর্মকর্তাদের হাঁটাচলাই পাল্টে গেছে। টানটান হয়ে চলতে শুরু করায় উচ্চতা বেশি মনে হচ্ছে।
কিন্তু ভোটের দিন পর্যন্ত কিন্তু নিশ্চিত জয়ের কথা কেউ বলার সাহস দেখাতে পারেনি। এমনকি ভোটের আগের দিন পর্যন্ত শঙ্কর ঘোষের মুখেও তেমন হাসি ছিল না। বরং তিনি বারেবারে আক্ষেপ করেছেন, ১ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থানে বসার জন্য প্রায় ৫ দিন তিনি আটকে পড়েছিলেন। প্রচারে সমস্যা হয়েছে। এই আক্ষেপের মূলেই ছিল প্রবল চাপ। সব দল আপনমনে প্রচার করলেও শঙ্কর ঘোষ উঠতে বসতে গৌতম দেবকে আক্রমণ না করে যেন শান্তি পাচ্ছিলেন না। গৌতম কত লম্বা ব্যানার লাগালো, গৌতম কবে ক্লান্ত হল, সব নিয়েই বলার জন্য যেন শঙ্কর ঘোষ ঠিকা নিয়েছিলেন। প্রচণ্ড চাপ না থাকলে এভাবে কারও পেছনে আদাজল খেয়ে পড়ে না। তবে তাকে কেউ ফার্স্টবয় বললেও সেটা নিশ্চিত নয়।

গৌতম দেব

তৃণমূল প্রার্থী গৌতম দেবের সমর্থনে এবারের স্লোগান ছিল,‘‌শিলিগুড়ি নিজের অভিভাবককেই চায়’‌। এই স্লোগান রীতিমত হিট। ১১ জন প্রার্থীর মধ্যে শহরের অভিভাবক বলতে যে গৌতম দেবকেই বলা যায়, সেটা নিয়ে খুব বেশি মতানৈক্য ছিল না। গৌতম দেবের নেগেটিভ ছিল তাঁর ব্যবহার। গৌতম দেবের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মুখ ঝামটা খেতে হয়নি, এমন লোকের সংখ্যাটাই নাকি বেশি। তার সঙ্গে বিজেপি প্রার্থী ভোটের মুখে ইস্যু করে গৌতমের ঔদ্ধত্যকে। তিনি নাকি নিজের দলের কাউন্সিলরদেরও ঘরের বাইরে বসিয়ে রাখেন। চাইলেই দেখা করেন না। এই দুটি অভিযোগ ভেঙে সমতার জায়গায় নিয়ে আসতে গৌতম দেবকে অমানষিক পরিশ্রম করতে হয়েছে। শেষদিকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন, যে তিনি মানুষটাই আলাদা। তাই বলে ওই ‘‌মেজাজ হারানো’‌ মানুষটি ক্ষতিকর নন। পাশাপাশি তিনি সমস্ত স্বীকার করে নিয়ে প্রতিজ্ঞা করেন নিজেকে বদলে ফেলার এবং সেটি করেও দেখান। আজও সেই চেষ্টা চালিয়েই যাচ্ছেন। গৌতম দেবের এই সৎ অবস্থান অনেক মানুষের মন জিতে নিয়েছে। অনেক প্রগতিশীল বামমনস্ক মানুষও গৌতম দেবের হয়ে সওয়াল করেছেন এবারে। কারণ নাটক থেকে ক্রীড়ায় গৌতম দেব যেভাবে পাশে থেকেছেন, সব দলের মানুষকে জড়িয়ে নিয়েছেন, সেটা অনেককেই কৃতজ্ঞতায় বেঁধেছে। তাঁদের ভোটগুলিও তিনিই পেয়েছেন। কিন্তু সমস্যা হয়েছে নিজের দলের কিছু অভিমানী নেতাকে নিয়ে। যারা নিজেদের অপাংক্তেয় মনে করে শুরুতে গৌতম থেকে দূরত্ব তৈরি করেছিলেন। পরে এদের কিছুজন প্রচারে নামেন। কিন্তু শেষদিকে দেখা যায় আবারও গায়েব। সেইসঙ্গে কিছু কাউন্সিলর ওয়ার্ডে এমন পরিস্থিতি বানিয়ে রেখেছেন যে, সেখানে শতচেষ্টাতেও ভোট বাড়ানোর উপায় ছিল না। কিন্তু গৌতম দেব ব্যক্তিগত ভাবে শুধুমাত্র বাড়ি বাড়ি ঘুরে প্রচারের জন্য ৪০০ কিমি পথ হেঁটেছেন। এই পরিশ্রম ও প্রায় প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছানোর আলাদা গুরুত্ব আছে। সেসব কাজ করলে গৌতম দেবও ফার্স্টবয় হয়ে যেতে পারেন অনায়াসে।

শরদিন্দু চক্রবর্তী

বামেদের গুডবয়। প্রার্থী হবার পর থেকে ভোট পর্যন্ত একজন মানুষও সিপিএমের এই প্রার্থীকে নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করতে পারেননি। নেগেটিভ কমেন্টে যেটা শোনা গেছে, তা হল — ‘‌খুব ভাল প্রার্থী। কিন্তু এত ভাল মানুষ জিততে পারবেন না।’‌ এই কথাটিতে হতাশাজনক অভিব্যক্তি থাকলেও অন্যরকম একটি স্বীকৃতিও আছে। কথাটিই আস্ত একটি পুরস্কার। ফলে প্রতিযোগিতায় শরদিন্দু চক্রবর্তী (‌জয়)‌ জিতবেন কিনা অনিশ্চিত, তবে ইতিমধ্যে যে তিনি অজস্র মানুষের মন জিতেছেন, সেটা পরিষ্কার।

1 comment

Leave your comment