দুরন্ত প্রতিবেদন: দেশের ইতিহাসে এই প্রথম। একই সঙ্গে শিলিগুড়িতে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত পরিদর্শনে এলেন দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। এই যৌথ সফরকে কেন্দ্র করে যখন গোটা রাজ্যে সীমান্ত সুরক্ষার প্রশ্নে কেন্দ্রের ভূমিকার জয়ধ্বনি চলছে, ঠিক তখনই উত্তরবঙ্গ তথা শিলিগুড়ির অলিন্দে মাথাচাড়া দিল এক নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক। হাই-প্রোফাইল এই সীমান্ত পরিদর্শনে যেখানে মাটিগাড়ার বিধায়ক তথা রাজ্যের পরিবহন ও অর্থ দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী আনন্দময় বর্মনকে একেবারে অমিত শাহর পাশে দেখা গেল, সেখানে সম্পূর্ণ ব্রাত্য রইলেন শিলিগুড়ির ঘরের বিধায়ক তথা পর্যটন মন্ত্রী ড. শঙ্কর ঘোষ।

শিলিগুড়ির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ শহরের বিধায়ক এবং ক্যাবিনেট মন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও শঙ্কর ঘোষের এই অনুপস্থিতি সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মহলের চোখ এড়ায়নি। বরং খানিকটা খটকা লেগেছে। যদিও শঙ্কর ঘোষকে উত্তরবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকগুলি থেকে কিছুটা দূরে রাখা এই প্রথম নয়, বিগত দুই মাসের বিজেপি সরকারের সময়কালে একাধিকবার এমনটা ঘটেছে। যাকে নিছক কাকতালীয় কিংবা প্রোটোকল ভেবে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। নতুন সরকার গঠনের পর শঙ্কর ঘোষই শিলিগুড়ি পুরনিগমের দূর্নীতি নিয়ে সবচেয়ে বেশি সরব ছিলেন। অথচ সেই পুরনিগমগুলির পরিস্থিতি দেখতে যেদিন প্রথমবার পুরমন্ত্রী উত্তরকন্যায় এলেন, সেখানে শঙ্কর বাদে বাকি সব মন্ত্রীকে দেখা যায়। বিষয়টি অগ্নিমিত্রা পালকে জিজ্ঞাসা করলেও তিনি জানান, শঙ্কর নাকি কলকাতায় ব্যস্ত। অথচ শঙ্কর ঘোষ চুটিয়ে শিলিগুড়ি শহরের মধ্যেই নানা কর্মসূচি করছিলেন। একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী কি এতটুকু তথ্যও জানবেন না?

একইভাবে নতুন সরকার গঠনের পর নবনির্বাচিত বিধায়করা যেদিন শিলিগুড়িতে বিজয় মিছিল করেন, সেদিন মিডিয়া নতুন বিধায়কদের বক্তব্য নিতে মরিয়া ছিলেন। কিন্তু দেখা গেল, সেখানে মিডিয়ার সামনে বক্তব্য দিচ্ছেন সাংসদ রাজু বিস্তা। শংকর ঘোষ সেই মিছিল থেকে বেরিয়ে অন্যত্র গিয়ে কথা বলেন। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী প্রথম যেদিন পাহাড় সফরে যান, সেদিনও আনন্দময় বর্মন থেকে দুর্গা মুর্মুর মতো বিধায়করা ছিলেন, অথচ সেখানেও শঙ্কর ঘোষকে দেখা যায়নি।
হাই-প্রোফাইল সীমান্ত পরিদর্শনে যেখানে মাটিগাড়ার বিধায়ক তথা রাজ্যের পরিবহন ও অর্থ দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী আনন্দময় বর্মনকে একেবারে অমিত শাহর পাশে দেখা গেল, সেখানে সম্পূর্ণ ব্রাত্য রইলেন শিলিগুড়ির ঘরের বিধায়ক তথা পর্যটন মন্ত্রী ড. শঙ্কর ঘোষ। এর পেছনে কী কোনও কৌশল নাকি বিশেষ প্রোটোকল থাকতে পারে ?
এবারেও দেখা গেল অমিত শাহ যখন শুক্রবার এলেন, সেখানে শিলিগুড়ি মহকুমার সমস্ত বিধায়ক মন্ত্রী, সাংসদ সহ ছোট বড় বিজেপি নেতারাও বাগডোগরা বিমানবন্দরে স্বাগত জানাতে যান। শঙ্কর ঘোষও যান। কিন্তু পরদিন অর্থ্যাৎ শনিবারের সীমান্ত পরিদর্শনের যে ছবি প্রকাশ করা পিআইবির তরফে সেখানে দেখা যায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও মাটিগাড়ার বিধায়ক তথা মন্ত্রী আনন্দময় বর্মন মঞ্চ আলো করে আছেন। আর শিলিগুড়ি শহরের বিধায়ক তথা মন্ত্রী তথা উত্তরবঙ্গের অন্যতম মুখ শহরে বেসরকারি সংস্থার একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেবার পর নিজের মতো করে জেলা গ্রন্থগারের হাল দেখে বেড়াচ্ছেন।

এই ঘটনার পর গোটা শহরজুড়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। শঙ্করকে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকগুলি থেকে কিছুটা দূরে রাখা কী নেহাতই কাকতালীয় নাকি এর পেছনে কোনও দলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কৌশল রয়েছে?—কেন বারবার ব্রাত্য থাকছেন শঙ্কর ঘোষ?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই ঘটনার পেছনে গভীর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সমীকরণ থাকতে পারে। আনন্দময় বর্মন পরিবহন ও অর্থ রাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ায় সীমান্ত সংলগ্ন এলাকার পরিকাঠামো ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার পর্যালোচনায় তাঁর উপস্থিতি হয়তো বেশি প্রাসঙ্গিক ছিল। পাশাপাশি মাটিগাড়া নকশালবাড়িও ভারত-নেপাল সীমান্ত এলাকায় অবস্থিত বলে তাঁকে সঙ্গে রাখা হতে পারে।

তবে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন অন্য জায়গায়। একটি শহরের সামগ্রিক উন্নয়ন এবং সীমান্ত নিরাপত্তা জনিত জনজীবনে প্রভাবের ক্ষেত্রে স্থানীয় শিলিগুড়ির বিধায়কের মতামতও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বারবার তাঁকে এই ধরনের মেগা ইভেন্ট থেকে সরিয়ে রাখা কি কেবলই প্রোটোকলের গ্যাঁড়াকল, নাকি দলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার অলক্ষ্য লড়াইয়ের ফল? উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক চালচিত্রে শঙ্কর ঘোষের অবস্থানকে কি ইচ্ছাকৃতভাবেই সংকুচিত করার চেষ্টা চলছে?
ফলে এবারের শাহি সফর যেমন একদিকে দেশের সীমান্ত সুরক্ষায় এক নতুন নজির গড়ল, তেমনই অন্যদিকে শিলিগুড়ির শাসক শিবিরের অভ্যন্তরীণ সমীকরণকে এক বিরাট প্রশ্ন চিহ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে গেল। ব্রাত্য শঙ্করকে নিয়ে জনমানসে তৈরি হওয়া এই প্রশ্নের উত্তর আগামী দিনে উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে কী মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার।












