উত্তরবঙ্গ, ক্যাম্পাস, দেশ-‌দুনিয়া

‘‌সামসুল স্যার’‌ সত্যিই ‘‌এডুকেশন মাফিয়া’‌ ?‌

আগস্ট 30, 2026

মুরালীগঞ্জের প্রধান শিক্ষক সামসুল আলম

দুরন্ত প্রতিবেদন :‌ পশ্চিমবঙ্গের সরকারি স্কুল থেকে কার্যত মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে মানুষ। একেকটি সরকারি স্কুলের বেহাল ছবি ধরা পড়ে রোজ। ছাত্র আছে শিক্ষক নেই, শিক্ষক আছে ছাত্র নেই। এমন একটি পরিস্থিতিতে মুরালীগঞ্জ হাইস্কুলের পরিকাঠামো ও শিক্ষাপদ্ধতি তাক লাগিয়ে দেয়। যে ব্যবস্থাপনা দেখতে জার্মানি (Germany), যুক্তরাজ্য (UK), নেপাল (Nepal), ভুটান (Bhutan), বাংলাদেশ (Bangladesh), আফগানিস্তান (Afghanistan), ফিলিপাইনের (Philippines) মতো অন্তত ১২টি দেশের প্রতিনিধিরা স্কুল পরিদর্শনে এসেছিলেন। শিখে গিয়েছিলেন কীভাবে সরকারি স্কুলকেও মানুষের সহযোগিতা নিয়ে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়া যায়। দেড় দশকের মধ্যেই এই স্কুলের পালক হিসেবে যুক্ত হয়েছিল ৪টি বড় পুরস্কার। প্রধান শিক্ষক সামসুল আলম নিজেও পুরস্কৃত হয়েছিলেন। তিনিই দেখিয়ে দিয়েছিলেন, ইচ্ছে থাকলে বেসরকারি স্কুলকেও হার মানিয়ে দেওয়া যেতে পারে।

স্বর্গোদ্যানের মতো সাজানো সরকারি স্কুলের ক্যাম্পাস। মুরালীগঞ্জে

এতকিছুর পর সেই স্কুলের প্রধান শিক্ষককে শেষমেশ কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হল। অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের মতো একটি সংগঠনের উত্তরবঙ্গের দায়িত্বে থাকা রাজ্য সম্পাদক দীপ দত্ত অবলীলায় বলে দিলেন, এই প্রধান শিক্ষক একজন এডুকেশন মাফিয়া। প্রথমেই দীপের পুরো বক্তব্য জেনে নিই। তিনি সাংবাদিক সম্মেলন করে বলছেন, ‘প্রধান শিক্ষক ব্যক্তিগতভাবে অনেক দুর্নীতির সাথে যুক্ত রয়েছেন স্কুলে। তার সেই দুর্নীতিগুলোর সূত্রপাতকে কেন্দ্র করেই সেখানে ঝামেলা শুরু হয়েছে। সেখানে ফি বৃদ্ধি থেকে শুরু করে, টিসি থেকে শুরু করে, স্কুল ইউনিফর্ম থেকে শুরু করে, ডোনেশন থেকে শুরু করে—অনেকভাবেই তিনি সেখানে বাড়তি টাকা তোলেন। তার বাড়িতে ব্যক্তিগত এক্সিলারেটর রয়েছে, সেটি আলাদা বিষয়। এখানে যে স্কুল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, স্থানীয় এসআই রয়েছেন—তাদেরকেও তিনি পাত্তা দেন না। যারা স্কুলের অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে রয়েছেন, তাদেরকেও তিনি পাত্তা দেন না। স্কুলটিকে তিনি নিজের মতো করে চালান। এমনকি আলামিন মিশনের কিছু ছাত্র-ছাত্রী সেই স্কুলে অ্যাসাইন ছাত্র… ছাত্র মানে শিক্ষার্থী রয়েছে, তারা কোনওদিনও স্কুলে আসে না, কিন্তু সেই স্কুলের ছাত্র। তাদেরকে কীভাবে তিনি ছাত্র করে রেখেছেন—এই প্রশ্নটি আমরা রাখতে চাইছি। ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি করার জন্য একটি বিদ্যালয়কে তিনি ব্যবহার করছেন।

এই শিক্ষককেই ‘‌এডুকেশন মাফিয়া’ তকমা দিয়েছে এবিভিপি‌


তিনি বিদ্যালয়ের নামে একটি কর্পোরেট বিজনেস চালাচ্ছেন। একটি সরকারি স্কুলে কী করে প্রাইভেট বাস থাকতে পারে? ছাত্র-ছাত্রীদের থেকে জোরজবরদস্তি সেই বাসের ফি নেওয়া হয়। এমনকি জোরজবরদস্তি ডোনেশন নেওয়া হয়, না দিতে চাইলেও জোরজবরদস্তি ডোনেশন থেকে শুরু করে শীতের সময় ব্লেজার, ইউনিফর্ম, দামি ইউনিফর্ম জোরজবরদস্তি ছাত্র-ছাত্রীদেরকে কিনতে বাধ্য করা হয়। তার ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য বিদ্যালয়কে তিনি ব্যবহার করছেন, কর্পোরেট বিজনেস চালাচ্ছেন—ওনাকে ‘‌এডুকেশন মাফিয়া’‌ ছাড়া আর কিছু বলা যায় বলে মনে করছি না।’‌
প্রসঙ্গত, সামসুল আলম ২০০৩-‌০৪ সালে প্রধান শিক্ষক হিসেবে মুরালীগঞ্জে যোগ দেন। তখন রাজ্যে বাম সরকার। ২০০৪ সালের শেষ কিংবা ২০০৫ সালের একেবারে শুরুতে প্রথমবার বড় করে বার্ষিক অনুষ্ঠান হয়েছিল। সেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন তৎকালীন পুরমন্ত্রী অশোক ভট্টাচার্য। ২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সময়ে স্কুল নিয়ে প্রাথমিক পরিকল্পনা করা হয়। স্কুলের সঙ্গে স্থানীয় মানুষদের জুড়ে, তাদের সহযোগিতা নিয়ে পরিকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ বাম আমলেই শুরু হয়ে যায়। ২০১১ সাল থেকে ২০২১ সালের মধ্যে স্কুলের উত্থান হয়ে গেছে। সমস্ত পুরস্কার এই সময়েই পাওয়া।
যামিনী রায় পুরস্কার পেতেই এই স্কুলের নাম গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। কীভাবে এই পুরস্কার পায় একটি স্কুল ?‌ তার অনেকগুলি ধাপ থাকে। শুরুতেই বিদ্যালয়গুলির পরিকাঠামো, ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতি, একাডেমিক ফলাফল এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক তথ্যের ডিজিটাল নথি জমা করতে হয় পোর্টালে। কয়েকটি ধাপ পেরনোর পর পুরস্কার নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিদ্যালয়গুলিকে প্রধানত চারটি ক্ষেত্রের ওপর ভিত্তি করে নম্বর দেওয়া হয়— ১)‌ পরিকাঠামো ও পরিচ্ছন্নতা: নিরাপদ পানীয় জল, পৃথক ও স্বাস্থ্যানুকূল শৌচাগার, ছাত্রবন্ধ পরিবেশ, সীমানা প্রাচীর, শিশুদের খেলার পার্ক এবং ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষের ব্যবস্থা।
২)‌ একাডেমিক উৎকর্ষ: বার্ষিক ফলাফলের ধারাবাহিকতা, ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতির হার এবং গুণমানসম্পন্ন পঠনপাঠন ব্যবস্থা (যেমন: প্রজেক্টর বা BALA প্রজেক্টের ব্যবহার)।, ৩)‌ সহ-পাঠ্যক্রমিক কার্যক্রম :খেলাধুলা, চারুকলা, সামাজিক সাংস্কৃতিক সচেতনতা এবং পরিবেশ সুরক্ষায় বিদ্যালয়ের উদ্যোগ।

গ্রামের সাধারণ পরিবারের পড়ুয়াদের গায়েও ব্লেজার। এটা নিয়েও প্রশ্ন


৪)‌ স্কুল ব্যবস্থাপনা: সঠিক মিড-ডে মিল পরিচালনা, অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা, রেকর্ড ব্যবস্থার ডিজিটাইজেশন এবং সার্বিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা। এরপর স্কুল ইন্সপেক্টরদের একটি দল গোটা স্কুল পরিদর্শন করে রিপোর্ট দেবে এবং ডিস্ট্রিক্ট ইন্সপেক্টরদের একটি দল পরিদর্শন করে রিপোর্ট দেবে। সেই রিপোর্ট পোর্টালে জমাকৃত তথ্যের সাথে বিদ্যালয়ের বাস্তবিক পরিবেশের মিল রয়েছে কিনা তা সরেজমিনে যাচাই করে জেলাভিত্তিক একটি তালিকা তৈরি করা হয়।
এরপর জেলা স্তর থেকে সুপারিশকৃত সেরার সেরা স্কুলগুলির তালিকা রাজ্য শিক্ষা দপ্তরের কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে পাঠানো হয়। চূড়ান্ত মূল্যায়নে সেরা পারফর্ম করা স্কুলগুলিকে রাজ্যস্তরের শীর্ষ সম্মান ‘‌যামিনী রায় পুরস্কার’‌ প্রদানের জন্য মনোনীত করা হয়।
যামিনী রায় পুরস্কার প্রাপ্তির পরে পরপর শিশুমিত্র পুরস্কার, নির্মল বিদ্যালয় পুরস্কার সহ মোট ৪টি বড় পুরস্কার তাঁরা পান। প্রতিটি পুরস্কারের জন্য শিক্ষাদপ্তরের আধিকারিকরা দলবল নিয়ে স্কুলের খোঁজ খবর করতে এসেছেন। তাহলে কী সমস্ত স্কুল পরিদর্শক থেকে শিক্ষাদপ্তরের রথীমহারথীরাও সব চেপে গিয়ে পুরস্কার দিয়ে দিলেন?‌ স্কুলে শিক্ষার নামে ব্যবসা চলছে বলেও ২৫ বছর এলাকার কোনও অভিভাবক, রাজনৈতিক দলের নেতা কেউ কোনও টুঁ শব্দটি করলেন না ?‌ এবিভিপিও তো হঠাৎ গজিয়ে ওঠা সংগঠন নয়। তারাও কি এতদিন জানতেন না?‌ নাকি ২৫ বছর নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছিল?‌ আজ যখন এপাশে ওপাশে নিজেদের সরকার, নিজেদের নেতাদের ভিড় তখন আচমকা বিপ্লবী হয়ে উঠলেন !‌ এই যে স্কুলে এতো দেশ-‌বিদেশের মানুষ আসতেন, তাঁরা কী কাটমানি নিতে স্কুল পরিদর্শন করতেন? এখন অনেক শিক্ষকও সামাজিক মাধ্যমে প্রবন্ধ নিবন্ধ লিখছেন— তাঁরাও তো সব জানতেন, বুঝতেন। কেন বলেননি এতদিন কথা ?‌ বরং স্কুলের একেকটি কৃতিত্বের খবরের নীচে প্রশংসাসূচক কমেন্ট করতেন। ‌
ফলে হুজুগে মেতে ওঠা নয়, গোটা বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করে তারপর মন্তব্য করা প্রয়োজন। এটি কোনও পঞ্চায়েতের রাজনীতি নয়। এটি শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয়। যে শিক্ষা এই রাজ্যে মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে। সেখানে শেষ পেরেক পোঁতার আগে ১০ বার ভাবার প্রয়োজন। স্কুলের এই গোটা ঘটনার পেছনে বড় কোনও চক্রান্ত নেই তো?‌ এই স্কুল থাকার জন্য আশপাশের বেসরকারি স্কুলগুলি পর্যাপ্ত পড়ুয়া পায় না। সেইসব স্কুল পেছন থেকে ছড়ি ঘোরাচ্ছে না তো?‌ প্রধান শিক্ষক অত্যন্ত কঠোর অথচ নরম। যে কাউকে স্কুলে যা কিছু করার অনুমতি দেন না। রাশ নিজের হাতেই রাখেন। এটাই কারও মাথা ব্যাথার কারণ নয়তো?‌ অনেকেই স্কুলের নেতা হতে চান, কিন্তু না পেরে সর্বনাশের চক্রান্ত করছে না তো?‌ নাকি সত্যিই প্রধান শিক্ষক এডুকেশন মাফিয়াগিরি করছেন?‌


যারা অভিযোগ তুলেছেন, তারা নিশ্চয়ই জানেন— এডুকেশন মাফিয়া বলতে কী বোঝায়—
এডুকেশন মাফিয়াদের মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে স্কুলের আসন বিক্রি করা। এডুকেশন মাফিয়া মানে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র আগেই ফাঁস করে মোটা দামে বিক্রি করা। যেভাবে নিটের প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছিল। এডুকেশন মাফিয়া মানে কোনও রকম পাঠদান বা পরীক্ষা ছাড়াই টাকার বিনিময়ে ভুয়া সনদপত্র বিক্রি করা। এডুকেশন মাফিয়া মানে স্কুলে ঠিকমতো না পড়িয়ে শিক্ষার্থীদের জোরপূর্বক নির্দিষ্ট কোচিং সেন্টারে যেতে বাধ্য করা।
প্রধান শিক্ষক সামসুল আলম কি এমন কাজ সত্যিই করেছেন?‌ করে থাকলে শাস্তি তো পেতেই হবে।

(‌ক্রমশ)‌

3 comments

  • Amader head sr samsul Alam khub valo

  • Asit Baran Biswas

    সামসুল আলম শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক হওয়ার যে দীর্ঘ লড়াই যে সংগ্রাম সেটা যারা বোঝেনা তাদের দেওয়া স্বীকৃতি (তকমা) মাস্টারমশের ব্যক্তিগত ইমেজে কোন প্রভাব ফেলবে না।ধ্বংস হয়ে যাবে ওনার স্বপ্ন। যা তিনি অত্র এলাকার শুভ চিন্তাশীল মানুষদের সঙ্গে গড়ে তুলেছেন। এতে গজিয়ে ওঠা নেতাদের কোনো অবদান নেই। আরো খোঁজ নিয়ে দেখবেন যারা আজ বিদ্যালয় টিকে কালিমালিপ্ত করল তাদের কয়জন আত্মীয় এই বিদ্যালয়ে পড়ে।

  • Partha Bhowmick

    ওনাকে সরাতে না পারলে এই স্কুলে কোনো সাম্প্রদায়িক শক্তি নিজেদের স্থান তৈরী করতে পারবে না। সেজন্যই ওনাকে বদনাম করছে।

Leave your comment