মুরালী সিরিজ–২
দুরন্ত প্রতিবেদন : শিক্ষকতায় অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য মুরালীগঞ্জ হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক সামসুল আলম পেয়েছেন ‘শিক্ষারত্ন’ পুরস্কার এবং স্কুলের জন্য ছিনিয়ে এনেছেন পুরস্কারের ডালি। সেই প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধেই এবারে কার্যত ফোর-টয়েন্টির মামলা করা হল। আর এই মামলা করলেন খোদ বিধাননগর সার্কেলের স্কুল পরিদর্শক সাধন বিশ্বাস। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার মোট ৯টি ধারায় প্রধান শিক্ষক সামসুল আলমের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে ফাঁসিদেওয়া থানায়। এই মামলার তদন্তের ভার পড়েছে বিধাননগর ফাঁড়ির এসএসআই সুবল চন্দ্র বর্মণের ওপর। যে ঘটনা গোটা বিধাননগর সহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। শিক্ষক দিবসে এর চেয়ে বড় পুরষ্কার আর কী হতে পারে !
‘শিক্ষারত্ন’ সামসুল আলমের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৩১৮(৪) নম্বর ধারা সহ ৯টি ধারাতে মামলা হয়েছে। প্রতারণা করা এবং ছলনা করে কোনও সম্পত্তি বা অর্থ হস্তান্তর করলে ৩১৮(৪) নম্বর ধারায় মামলা দায়ের হয়। অর্থ্যাৎ Cheating & Dishonestly Inducing Delivery of Property। যা পুরনো IPC-র (ইন্ডিয়ান পিনাল কোড) ৪২০ ধারার সমতুল্য। পাশাপাশি এসআই সাধন বিশ্বাস যে অভিযোগপত্র জমা করেছেন, সেখানে আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং অভিভাবকদের ভয়ভীতি দেখানোর মতো গুরুতর অভিযোগের কথা জানিয়েছেন বলে জানা গেছে।

অবাক করা কথা হল, কোনও স্কুলের একজন পড়ুয়াকে সামান্য শাসন করলেই যখন খবর ভাইরাল হয়, সেই জায়গায় থেকে বিগত ২৬ বছর ওই স্কুলের কোনও অভিভাবক আজ পর্যন্ত একটিও অভিযোগ জমা করেননি। তাহলে একজন স্কুল পরিদর্শক আচমকা কাদের কথায় অভিযোগ জানালেন যে, স্কুলে পড়ুয়াদের মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করা হয় ? কারণ অত্যাচার তো একটি অভ্যাস। হঠাৎ কেউ একদিন অত্যাচার করতে পারেন না।
দ্বিতীয়ত, মুরলীগঞ্জ স্কুলে প্রধান শিক্ষক যে গতানুগতিক ছক ভেঙে একটি নতুন মডেল তৈরি করছিলেন এবং সেই মডেলে সফলতা ছিনিয়ে এনে দেখিয়েছেন, সমস্তটাই প্রমাণিত সত্য। এবং স্থানীয় শিক্ষা চক্র থেকে শিক্ষা দপ্তরের বড় বড় কর্তারা পর্যন্ত এই বিষয়ে অবগত। সকলেই বিদ্যালয়ে সশরীরে হাজির হয়ে সমস্ত দেখে গেছেন এবং ভূয়সী প্রশংসা করে গেছেন। সেসব নিয়ে বিভিন্ন সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হয়েছে। দীর্ঘ প্রায় ৩ দশকে কেউ আপত্তি তোলেননি। তাহলে আচমকা সেই শিক্ষা দপ্তরের একেবারে নীচু পর্যায়ে কাজ করা স্কুল পরিদর্শক কীভাবে এত বিচিত্র অভিযোগ করতে পারলেন? আর এই অভিযোগ করলেও প্রশ্ন ওঠে, এতদিন তাঁরা কি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেননি কিংবা তারাও একই দড়িতে বাঁধা ছিলেন ? মতবিরোধ হতেই সব উগড়ে দিতে শুরু করেছেন? ফলে একইসঙ্গে অভিযোগকারীর ভূমিকা নিয়েও তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

একটি স্কুলে ১২টি স্কুল বাস, ১৭টি পুলকার চলছে, সেই বাস কী কোনও বদ্ধ ঘরে লুকিয়ে রাখা ছিল? সব তো প্রকাশ্য রাস্তায় চলাচল করেছে। তখন এই আধিকারিকরাই দায়িত্বে ছিলেন। তাঁরা তখন কোনও পদক্ষেপ নেননি কেন? এখন হঠাৎ বাস বা পুলকার রাখা অপরাধ হল কীভাবে?
সরকারি স্কুলে ফি ২৪০ টাকা। কিন্তু মুরলীগঞ্জে ২৪০ টাকার বাইরেও যে বিভিন্ন খাতে ফি নেওয়া হয়েছে, সেই বিষয়টিও ২০ বছর ধরে চলেছে। প্রতিটি ফি-এর জন্য রসিদও দেওয়া হয়েছে। অর্থ্যাৎ ফি সংগ্রহের প্রমাণ পর্যন্ত আছে। তা সত্ত্বেও এতদিন কোনও পদক্ষেপ নেননি কেন, এমনকি সতর্কও করতে পারতেন, সেটাও করা হয়নি। অথচ আচমকা সেটাকেই অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে সোজা থানায় এফআইআর করে দিলেন, এর পেছনে কী কোনও রহস্য আছে? আর যদি সত্যিই অপরাধ থাকে, তবে একই অপরাধে প্রধান শিক্ষকের পাশাপাশি এসআই, ডিআই, সিআই সকলেরই শাস্তি হওয়া প্রয়োজন।

একটি স্কুলে ছাত্রদের মধ্যে ঝামেলা হল। সেই ঝামেলার বিষয় চাপা পড়ে গিয়ে স্কুলে প্রধান শিক্ষকের অভিনব সব সিদ্ধান্তগুলিকে কাঠগড়ায় তোলার বিষয়টিকেই প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। তবে কি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এটাই লক্ষ্য ছিল? নাকি চারপাশের আরও সাধারণ কিছু সরকারি স্কুলের মতোই এই স্কুলকে অথর্ব করে তোলার চক্রান্ত চলছে? যাতে আশাপাশের ইংরেজি মাধ্যম স্কুল বাড়তি সুবিধা পেতে পারে ? — এমন অজস্র অভিযোগ ওঠা শুরু হয়ে গেছে। ফলে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্তের পাশাপাশি এই বিষয়গুলি নিয়েও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
এরসঙ্গে প্রয়োজন রাজ্য বিধানসভার অধ্যক্ষ রথীন্দ্র বসুর হস্তক্ষেপ। তিনি কথা দিয়েছিলেন মুরালীগঞ্জের ৫০ জন পড়ুয়াকে বিধানসভা ভবন ঘুরিয়ে দেখাবেন। কারণ তিনি নিজেই সম্প্রতি স্কুল পরিদর্শন করে অভিভূত হয়েছিলেন। তিনি পরিদর্শন করে যাবার পর থেকে এই স্কুলটিতে এতকিছু ঘটতে শুরু করেছে— তাহলে তাঁরও তো কৌতূহল হওয়া স্বাভাবিক, এত নামী স্কুলে আচমকা এত অভিযোগ কোত্থেকে আমদানি হল? এমন হলে তো তাঁরও মাথা হেট হয়ে যাওয়ার কথা ! তিনি অন্তত চাইবেন না, একটি বিশ্বমানের স্কুলে আচমকা অন্ধকার নেমে আসুক। অতএব আরেকবার স্কুলে আসুন মাননীয় অধ্যক্ষ... (ক্রমশ)











