রিয়েল এস্টেট, শিলিগুড়ি

বিল্ডিং প্ল্যান ছাড়াই গগনচুম্বী বহুতল !‌

আগস্ট 8, 2026

দুরন্ত প্রতিবেদন :‌ বিল্ডিং প্ল্যানই নেই। অথচ একেবারে প্রশাসনের নাকের ডগায় গগনচুম্বী বহুতল নির্মাণ হয়ে গেছে শিলিগুড়িতে। তাও একটি বহুতল নয়, একাধিক। এসজেডিএ’‌র ‌(‌শিলিগুড়ি-‌জলপাইগুড়ি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) থেকে কোনওরকমে এলইউসিসি (‌Land use compatibility certificate) ‌‌‌নিয়েই নির্মাণকাজ করা সারা। LUCC ‌‌পেলেও নিয়ম মেনে যে বিল্ডিং প্ল্যান করতে হয়, সেসব জানা সত্ত্বেও করেনি অভিযুক্ত সংস্থা। ‌আর এই কাজগুলি হয়েছে বেশিরভাগ এসজেডিএ দপ্তরের আশেপাশেই। গোটা বিষয়টি এসজেডিএ’‌র ১৫১তম বোর্ড মিটিংয়ে উঠেছে এবং কড়া সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এদের বিরুদ্ধে খুব বড় পদক্ষেপ যে নেওয়া হবে না, সেটা এখনই আঁচ করা যাচ্ছে। মনে করা হচ্ছে বড়সড় জরিমানা করে সব বে-‌আইনি কাজকর্মকে আইনি অর্থ্যাৎ বৈধতার তকমা দেওয়া হবে। টাকার কাছে আবারও হেরে যাবে সমস্ত বে-‌আইনি কারবার। সাধারণ মানুষ সেসবের হাওয়া বাতাস পর্যন্ত পাবেন না।

বিল্ডিং প্ল্যান ছাড়া বহুতল শিলিগুড়িতে। প্রশাসনের বুলডোজার এখানে নরম !‌


রাজ্যের যে কোনও এলাকাতেই কোনও বহুতল নির্মাণ করতে হলে আগে জমি ব্যবহারের জন্য একটি ছাড়পত্রের প্রয়োজন হয়। পুর আইন অনুযায়ী শিলিগুড়িতে সেই ছাড়পত্র দেবার অধিকার রয়েছে এসজেডিএ অর্থ্যাৎ শিলিগুড়ি-‌জলপাইগুড়ি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের। এরপর শহর এলাকায় হলে শিলিগুড়ি পুরনিগম ও গ্রামীণ এলাকায় হলে পঞ্চায়েতের থেকে বিল্ডিং প্ল্যান অনুমোদন করাতে হয়। তারপর সেই বিল্ডিং নির্মাণ করতে পারেন কেউ। এক্ষেত্রে পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি ও মহকুমা পরিষদের পৃথক এক্তিয়ার করে দেওয়া আছে। কিন্তু শিলিগুড়িতে এমন কিছু আকাশচুম্বী বহুতল তৈরি হয়েছে, যার কোনও বিল্ডিং প্ল্যানই নেই। বিল্ডিং বানানোর পর প্ল্যানের আবেদন করা হয়েছে। শুধুমাত্র এলইউসিসি অর্থ্যাৎ ল্যান্ড ইউস কম্প্যাটিবিলিটি সার্টিফিকেট নিয়েছে এসজেডিএর কাছ থেকে। তাও আবার এসজেডিএ’‌র নাকের ডগাতেই এই বে-‌আইনি কাজ করে ফেলা হয়েছে। সেটাও একটি বহুতল নয়, একাধিক। এই ঘটনা শুনে রীতিমত চক্ষু চড়কগাছ পর্যটন মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ ও অর্থ দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী আনন্দময় ঘোষের।


যেখানে বিল্ডিং প্ল্যান সামান্য লঙ্ঘন করলেই সাধারণ মানুষের নির্মাণ ভেঙে ফেলা হয়, সেখানে প্ল্যান ছাড়াই কেউ বহুতল নির্মাণ করে পার পেয়ে যাবে?‌ মন্ত্রী আনন্দময় বর্মন জানান,‘‌গোটা বিষয় খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে। অবশ্যই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ কঠোর ব্যবস্থা তো হবে, কতটা কঠোর?‌ বে-‌আইনি নির্মাণ কি গুড়িয়ে দেওয়া হবে?‌ এখানে কিন্তু নরম হয়ে যান মন্ত্রীও। জানান,‘‌যদি বিল্ডিং তৈরির পর প্ল্যান করা হয়, কিন্তু বহুতল তৈরির ক্ষেত্রে প্ল্যানের বাইরে গিয়ে তেমন কিছু না করা হয়, তবে সেক্ষেত্রে হয়তো বিল্ডিং ভাঙার পথে না গিয়ে মোটা অঙ্কের জরিমানা করা যেতে পারে। কিন্তু নির্মাণটাই যদি বে-‌আইনি হয়, প্ল্যান না মানা হয়, তবে গুড়িয়ে দেওয়া হবে।’‌ অর্থ্যাৎ মন্ত্রী শুরুতেই সহানুভূতির জায়গা তৈরি করে রাখলেন।


মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ জানান,‘‌যে বেনিয়মের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল গত ১৫ বছরের তৃণমূল সরকার, সেই বেনিয়মের ফাঁদে পা দিয়ে অসাধু আধিকারিকদের যোগসাজশে প্রচুর পরিমাণ দুর্নীতি হয়েছে। আমরা এসজেডিএ-র ক্ষেত্রে একটি ইন্টারনাল এনকোয়ারি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। একইভাবে পুরনিগমেও বিল্ডিংয়ের ক্ষেত্রে এই একই ধরনের একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হবে। এ ব্যাপারেও কমিশনারকে পুরমন্ত্রী প্রকাশ্যে বলে গিয়েছিলেন। ফলে এই কাজকে ত্বরান্বিত করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। আর নিয়ম ভঙ্গ নিয়ে যে বড় বড় রিয়েল এস্টেটের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, বিল্ডিং প্ল্যান ছাড়া কাজ হয়েছে, তার জন্যই আমরা ইন্টারনাল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ এনকোয়ারি কমিটি করছি।’‌ আনন্দময় বর্মন যখন একেবারে সহজে সহজ কথা জানিয়ে দিয়েছেন, মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ কিন্তু একেবারে পোক্ত প্রশাসকের মতো তদন্ত কমিটির ঘাড়ে ছেড়ে দিলেন। আর তদন্ত কমিটির পরিণতি কী হয়, সেসব আমাদের সকলেরই জানা। একদিন এসব মানুষ ভুলে যাবেন। বিল্ডিংয়ের সমস্ত নথি নতুন করে তৈরি হয়ে যাবে এবং কোটি কোটি টাকায় সেই বহুতলের ফ্ল্যাট বিক্রি হবে। নাকি সত্যিই বড় পদক্ষেপ হবে?‌

Leave the first comment