দুরন্ত প্রতিবেদন : তিনটি নাম। তিনজন মানুষ। সুতপা সাহা, শ্যামলী সেনগুপ্ত ও মহুয়া চৌধুরী। উত্তরবঙ্গ তো বটেই বাংলা সাহিত্যজগতেও শিলিগুড়ির এই তিন নারী ক্রমশ পরিচিতির ব্যপ্তি বাড়িয়ে চলেছেন। এদের মধ্যে সুতপা সাহা শিলিগুড়ির সূর্য সেন মহাবিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক। বিগত ১৮ বছর ধরে শিলিগুড়ির সুপরিচিত সাহিত্য পত্রিকা ‘মল্লার’-এর সম্পাদক মণ্ডলীর সঙ্গে যুক্ত। তার সঙ্গে নিয়মিত অনুবাদের কাজ করে চলেছেন, যা সাহিত্য আকাদেমি, দে’জ পাবলিশিং, যাপনচিত্র, পরবাস, কথা সোপান, ভাষাবন্ধন সহ বহু নামী পত্রিকা ও সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। তারচেয়েও বড় কথা সুতপা সাহা একজন ভাল মানুষ, ভাল বক্তা, পড়ুয়া, পরিশ্রমী অথচ অতীব সাধারণ। শ্যামলী সেনগুপ্ত মূলত কবি ও অনুবাদক। ২০০৭ সাল থেকে তিনি ওড়িয়া থেকে বাংলা এবং বাংলা থেকে ওড়িয়া ভাষায় ধারাবাহিক অনুবাদ করে চলেছেন। এ পর্যন্ত অন্তত ২১টি বই অনুবাদ করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প ও নাটক। তাঁর নিজের ৩টি কাব্যগ্রন্থও হয়েছে। অনুবাদের কাজ করেই তিনি সর্বত্র পরিচিত। মহুয়া চৌধুরী আবার একাধারে কবি, অনুবাদক এবং সম্পাদক। তাঁর সম্পাদিত ‘ন হন্যতে’ ভীষণ সমাদৃত। মহুয়ারও জোড়া কাব্যগ্রন্থ রয়েছে। বহুগুণে গুণান্বিত তিন নারী একসঙ্গে প্রায় ৩২টি বাংলা কবিতাকে বিস্তৃত পরিসর তৈরি করে দিলেন।

আলোচনা এগোনোর আগে শিলিগুড়ির আরেক গুণী কবি সেবন্তী ঘোষের একটি কবিতা পড়ে নিই—
যেভাবে
সেবন্তী ঘোষ
আমাকে যারা ছেড়ে গেছে
তারাই আবার চেয়েছে আমাকে
যেভাবে বহুতল বানানোর পর
নিচে পড়ে থাকা
পুকুরের দিকে তাকায় মালিক
যেভাবে খেলনা ভাঙার পর
শিশু আবার জোড়া দেওয়ার চেষ্টা করে
আর যেভাবে দেশভাগ হওয়ার পর
পুরোনো ম্যাপের দিকে চেয়ে
দীর্ঘশ্বাস ফেলে মানুষ।
—কবি সেবন্তী ঘোষের অসাধারণ কবিতা এটি। যা মানুষের অবহেলা, বিলম্বে প্রাপ্ত উপলব্ধি এবং অপূরণীয় ক্ষতি থেকে জন্ম নেওয়া অনুশোচনার মনস্তত্ত্বকে কেন্দ্র করে রচিত। যা কিছু একদা অবহেলায় ছেড়ে দেওয়া হয় বা ধ্বংস করা হয়, হারিয়ে যাওয়ার পর তার মূল্য অনুধাবন করার চিরন্তন মানবীয় ট্র্যাজেডিই এই কবিতার প্রধান বিষয়বস্তু। ফলে কবিতাটি পড়ার পর অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকতে হয়। ভাবতে হয়।
কবি শুরুতেই এক পরম সত্য তুলে ধরেছেন— “আমাকে যারা ছেড়ে গেছে / তারাই আবার চেয়েছে আমাকে”। এই দুটি বাক্য কেবল কোনও ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন নয়, বরং মানবচরিত্রের এক সর্বজনীন প্রবণতা। মানুষ প্রায়শই উপস্থিত বস্তুর বা সময়ের কদর করে না, অথচ তা চিরতরে হারিয়ে গেলে এক তীব্র আকুলতা অনুভব করে। এই উপলব্ধির গভীরতা বোঝাতে কবি তিনটি অত্যন্ত শক্তিশালী রূপকও ব্যবহার করেছেন:
প্রথমত, নগরায়ণ ও প্রকৃতির দ্বন্দ্ব প্রকাশ করতে তিনি লিখেছেন,‘যেভাবে বহুতল বানানোর পর/ নিচে পড়ে থাকা/ পুকুরের দিকে তাকায় মালিক’। অর্থ্যাৎ বহুতল ভবন নির্মাণের মোহে মানুষ পুকুর ভরাট করে বা প্রকৃতিকে ধ্বংস করে। কিন্তু সেই বহুতলের উঁচুতে দাঁড়িয়ে যখন মালিক নিচে পড়ে থাকা অবশিষ্ট জলাশয়ের দিকে তাকায়, তখন তার ভেতরে এক অস্ফুট শূন্যতা ও অনুতাপ জেগে ওঠে। এটি মানুষের অন্ধ আধুনিকতা এবং হারিয়ে ফেলা প্রকৃতির প্রতি দেরিতে জাগা অনুশোচনার প্রতীক।
দ্বিতীয়ত, আবেগ ও অপরিপক্বতার ট্র্যাজেডি প্রকাশ করতে লেখেন,‘যেভাবে খেলনা ভাঙার পর/ শিশু আবার জোড়া দেওয়ার চেষ্টা করে’। অর্থ্যাৎ অবহেলায় বা ক্ষোভের বশে একটি শিশু যেভাবে নিজের খেলনা ভেঙে ফেলে, আর পরক্ষণেই ব্যাকুল হয়ে তা জোড়া দেওয়ার অবাস্তব চেষ্টা করে— ঠিক তেমনি মানুষও ক্ষণিক আবেগে সম্পর্ক বা বিশ্বাস ভেঙে ফেলে। পরবর্তীতে সেই ভাঙা সম্পর্ক জোড়া লাগানোর আকুলতা দেখা দিলেও তা আর কখনো পূর্বের রূপ পায় না।
তৃতীয়ত, ঐতিহাসিক ক্ষত ও দেশভাগ মনে করে কবি লেখেন,‘আর যেভাবে দেশভাগ হওয়ার পর/ পুরোনো ম্যাপের দিকে চেয়ে/ দীর্ঘশ্বাস ফেলে মানুষ।’ অর্থ্যাৎ দেশভাগের মতো সামাজিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে যায় এবং নতুন সীমান্ত তৈরি হয়। কিন্তু বহু বছর পর যখন কোনো মানুষ পুরোনো অবিন্যস্ত মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, তখন স্পষ্ট হয় যে সীমান্ত টেনে মানুষকে আলাদা করা গেলেও মানুষের স্মৃতি ও মূলের টানকে মুছে ফেলা যায় না।
মূল কথা হল, কাছে থাকার সময় গুরুত্ব না দিয়ে হারিয়ে যাওয়ার পর আকুলতা প্রকাশ করা মানুষের এক অমোঘ স্বভাব। তবে এই অনুশোচনা যখন আসে, তখন সময় ও পরিস্থিতি আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় না। অপলক চেয়ে থাকা, নষ্ট হওয়া জিনিস জোড়া লাগানোর নিরর্থক চেষ্টা কিংবা একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া তখন আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।
এই আকুলতা ও দীর্ঘশ্বাস কোনও একটি দেশের নয়, বরং প্রতিটি দেশে প্রতিটি মানুষের। এমন মনস্তত্ত্বকে তাই বিশ্বের দরবারেই তুলে ধরা প্রয়োজনীয় বলে শিলিগুড়ির তিন অনুবাদক গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন। এবং এমন ৩২ জন কবির ৩২টি বাংলা কবিতাকে ইংরেজি, অসমীয়া ও ওড়িয়া ভাষায় অনুবাদ করে এক মলাটের মধ্যে ঠাঁই করে দিয়েছেন। বইটি পড়তে শুরু করলে আরও মুগ্ধ হতে হয় তিন অনুবাদকের নিখুঁত অনুবাদের স্বাদ নিতে নিতে।

চলুন এবারে সেবন্তী ঘোষের ‘যেভাবে’ কবিতাটির পরপর তিনটি অনুবাদ দেখে নিই—
ইংরেজি প্রথম অনুবাদটি করেছেন অধ্যাপক সুতপা সাহা—
That is the way
Sebanti Ghosh
Those who deserted me
They only wanted me back
The way after erection of a lofty height, the owner looks at
the pond lying below.
The way a child tries to join the broken pieces of toy
And the way after Partition people sigh
While looking at the old yellow maps.
অসমীয়া ভাষায় অনুবাদ করেছেন মহুয়া চৌধুরী—
যেদৰে
সেৱন্তী ঘোষ
যিসকলে মোক এৰি গৈছিল
তেওঁলোকেই আকৌ মোক বিচাৰে
যিদৰে অট্টালিকা নিৰ্মাণৰ পিছত
তলত ৰৈ যোৱা
পুখুৰীৰ দিশে চায় মালিকে
যিদৰে ভাঙি যোৱা খেলনাৰ টুকৰা
যোৰা লগাবলৈ চেষ্টা কৰে শিশুৱে
আৰু যিদৰে দেশ ভাগ হোৱাৰ পিছত
পুৰণি মেপৰ ফালে চাই দীর্ঘশ্বাস পেলায় মানুহে।
ওড়িয়া ভাষায় অনুবাদটি করেছেন শ্যামলী সেনগুপ্ত—
ସେମିତି
ସେବନ୍ତୀ ଘୋଷ
ଯେଉଁମାନେ ମୋତେ ଛାଡ଼ି ଚାଲିଯାଇଥିଲେ
ସେହିମାନେ ହିଁ ପୁଣି ମୋତେ ଫେରି ପାଇବାକୁ ଚାହିଁଲେ—
ଯେପରି ଏକ ଉଚ୍ଚ ଅଟ୍ଟାଳିକା ନିର୍ମାଣ ପରେ
ତା’ର ମାଲିକ,
ତଳେ ଥିବା ପୋଖରୀକୁ ଚାହିଁ ରହେ।
ଯେପରି ଗୋଟିଏ ଛୋଟ ପିଲା
ତା’ର ଭଙ୍ଗା ଖେଳଣା…
ଖଣ୍ଡଗୁଡ଼ିକୁ ଯୋଡ଼ିବା ପାଇଁ
ଚେଷ୍ଟା କରେ
ଏବଂ ଯେପରି ଦେଶ ବିଭାଜନ ପରେ
ଲୋକେ ପୁରୁଣା ମାନଚିତ୍ରକୁ ଚାହିଁ ଦୀର୍ଘଶ୍ୱାସ ପକାନ୍ତି।
ওড়িয়া বর্ণ বুঝতে যেহেতু প্রায় অসম্ভব, তাই বর্ণগুলিকে বাংলা হরফে দেওয়া হল—
সেউঁভাৱে
সেৱন্তী ঘোষ
যেউঁমানে মোতে ছাড়ি চালিয়াাইথিলে
সেমানে মো পাখকু ফ়েরিলে পুনর্ৱার
যেপরি বহুতল কোঠা নির্মাণ পরে
ভূমি উপরে শোইথিৱা পোষাককু দেখুথাএ
কোঠার মালিক,
যেপরি খেলনা ভাঙিগলে
তাকু জোড়িৱার মিছ চেষ্টা
করুথাএ শিশু,
আউ ঠিক সেহিপরি…
দেশভাগ হেৱা পরে
পুরুণা মানচিত্রকু চাহিঁ
যেপরি দীর্ঘশ্বাস পাকান্তি দেশৱাসী।
সেবন্তী ঘোষ তাঁর কবিতায় যে অনুভূতিমালা সাজিয়েছেন, সেগুলির স্বাদ ও গন্ধ কতটা অমলিন রেখে তিনজন অনুবাদ করলেন, সেই অংশটুকু বিস্তারিত প্রকাশিত হবে ‘শারদীয় সাতদিন’ ম্যাগাজিনে। সেখানে কবি লেখক কৌশিক জোয়ারদার, অনুবাদক অসীমা সরকারের বিশ্লেষণ সমস্ত সন্নিবদ্ধ থাকবে।
সেই শারদ সংখ্যা প্রকাশের আগে কেউ অনুবাদগ্রন্থটি পড়তে চাইলে শিলিগুড়ি চার্চ রোডের চন্ডাল বুকসে গেলেই পেয়ে যাবেন আস্ত ‘চতুষ্পর্ণী-১’। মূল্য মাত্র ৩০০ টাকা। প্রকাশকের থেকে নিলে কিছু কমেও পেতে পারেন।













1 comment
Sutapa Saha
সাতদিন- নিউজ চ্যানেলকে বিশেষ কৃতজ্ঞতা বিশদভাবে চতুষ্পর্ণী-১ -এর বিষয়টিকে তুলে ধরার জন্য। এই চুলচেরা বিশ্লেষণ সাতদিন-এর পাঠকদের বইটির প্রতি আগ্রহ বাড়িয়ে দেবে সন্দেহ নেই , এই তিন অনুবাদককেও উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করবে। কৌতূহলের সঙ্গে অপেক্ষায় থাকবো সাতদিন শারদ সংখ্যাটির জন্য। সেবন্তী ঘোষের কবিতা ও তিনটি ভাষায় সেই কবিতার অনুবাদ নিয়ে বিশ্লেষণ ও আলোচনা পড়ার জন্য সাগ্রহে অপেক্ষায় থাকবো। সাতদিন নিউজ চ্যানেলকে অকুন্ঠ ধন্যবাদ জানাই ।