দুরন্ত প্রতিবেদন: শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে সোমবার গোটা বাংলাজুড়ে হইহই রইরই করে চর্চা হল। পালিত হল তাঁর ১২৫তম জন্মবার্ষিকী। অথচ স্বাধীনতার পরিবর্তী সময়ে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিকে সেভাবে চিনেই উঠতে পারেননি আমবাঙালি। তিনি কতটা বড় মাপের মানুষ ছিলেন, কতটা প্রতিভাশালী ছিলেন, সবই অজানা আমাদের অনেকের কাছেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গান্ধীজী, নেতাজী, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ আমাদের দার্জিলিং জেলার কোথায় এসে থাকতেন, কী করতেন, সবই যেন জলভাত। এই চর্চা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিকে নিয়ে প্রথম সোমবার শুরু হল শিলিগুড়ি সহ গোটা বাংলায়।

আশ্চর্যের বিষয় হল, শিলিগুড়িতে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির আসাযাওয়াও ছিল বিস্তর। অনেকবার তিনি শিলিগুড়িতে এসেছেন। দেশ স্বাধীন হবার আগে ও পরে বারেবারে এসেছেন শিলিগুড়িতে। থেকেছেন। স্বাধীনতার আগে বেশ কয়েকবার শিলিগুড়ি এসে হিলকার্ট রোডের অবনীনাথ ভট্টাচার্যের বাড়িতে উঠতেন। কে এই অবনীনাথ ভট্টাচার্য ?
অবনীবাবুর দৌহিত্র অর্থ্যাৎ অবনী ভট্টাচার্যের মেয়ের ঘরের সন্তান সুদীপ্ত মজুমদার সোমবার শিলিগুড়ি দীনবন্ধু মঞ্চে দাঁড়িয়ে জেলাশাসক, এনবিডির সচিব, জেলা তথ্য সংস্কৃতি আধিকারিকের উপস্থিতিতে জানালেন, অবনীনাথ ভট্টাচার্য ছিলেন তাঁর নিজের দাদু। মায়ের বাবা। বিখ্যাত আইনজীবী। আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে গর্বের সঙ্গে বলতে পারি আমার দাদু ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির সহপাঠি। একসঙ্গে একই কলেজে লেখাপড়া করতেন। লেখাপড়াতে দুজনেই ছিলেন তুখোড়। ফলে উভয়ের বন্ধুত্বও ছিল নিবিড়। সেই বন্ধুত্বের টানেই বার কয়েক শিলিগুড়ি এসেছেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি। অনেক সময় কাজের জন্য এদিকে এলে বন্ধুর বাড়িতে উঠে আলোচনা সেরে আবার ফিরে যেতেন।

উল্লেখ্য, সুদীপ্ত মজুমদার হলেন ভারতের একজন বিশিষ্ট আইনজীবী। আপাতত তিনি কলকাতা হাইকোর্টের ডেপুটি সলিসিটর জেনারেল অফ ইন্ডিয়া হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মূলত জলপাইগুড়ি সার্কিট বেঞ্চের ডেপুটি সলিসিটর জেনারেলের দায়িত্ব সামলান। এই সুদীপ্ত মজুমদারের মা ছিলেন জয়ন্তী মজুমদার। তাঁর বাবা ছিলেন অবনীনাথ ভট্টাচার্য। সোমবার শিলিগুড়ি দীনবন্ধু মঞ্চে দার্জিলিং জেলা তথ্য ও তথ্য সংস্কৃতি দপ্তর আয়োজিত শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে উঠে সুদীপ্তবাবু এই অজানা তথ্যের সন্ধান দেন। সুদীপ্তবাবু বলেন, তিনি তাঁর মামা বিচারপতি আনন্দময় ভট্টাচার্যের কাছ থেকে এসব জেনেছেন।
‘‘শিলিগুড়ির বিখ্যাত আইনজীবী অবনীনাথ ভট্টাচার্য ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির সহপাঠি। একসঙ্গে একই কলেজে লেখাপড়া করতেন। লেখাপড়াতে দুজনেই ছিলেন তুখোড়। ফলে উভয়ের বন্ধুত্বও ছিল নিবিড়। সেই বন্ধুত্বের টানেই বার কয়েক শিলিগুড়ি এসেছেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি।’’
বিচারপতি আনন্দময় ভট্টাচার্য ছিলেন ভারতের বিচারব্যবস্থার একজন অত্যন্ত বিশিষ্ট এবং উচ্চপদস্থ ব্যক্তিত্ব। তিনি কলকাতা ও বোম্বে (মুম্বাই) হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। শিলিগুড়ি হিলকার্ট রোডের জামে মসজিদ এখন যেখানে রয়েছে, তার পাশেই ছিল অবনীনাথ ভট্টাচার্যের কাঠের বাড়ি। এখন আর সেই কাঠের বাড়ির চিহ্নমাত্র নেই। সমস্ত বদলে গেছে। কিন্তু শিলিগুড়ির সঙ্গে যে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির বেশ গভীর সখ্যতা ছিল, সেই কথাগুলি এদিন স্মৃতির পাতা উল্টে বললেন।

ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, প্রখর জাতীয়তাবাদী রাজনীতিবিদ এবং স্বাধীন ভারতের প্রথম শিল্প ও সরবরাহ মন্ত্রী ছিলেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর অবিভক্ত বাংলার জলপাইগুড়ি ও দিনাজপুর জেলার একটি বড় অংশ পূর্ব পাকিস্তানে চলে যায়, আর শিলিগুড়ি ভারতের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্ট্র্যাটেজিক করিডর (চিকেনস নেক) এবং উত্তরবঙ্গের প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত হয়।
পূর্ব পাকিস্তান থেকে দলে দলে বাস্তুহারা হিন্দু শরণার্থীরা যখন শিলিগুড়ি এবং সংলগ্ন ডুয়ার্স অঞ্চলে আসতে শুরু করেন, তখন তাঁদের পুনর্বাসন ও ত্রাণের তদারকি করতেও নাকি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় শিলিগুড়ি সফর করেছিলেন। সেই সময় তিনি স্থানীয় মানুষের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী হিসেবে উদ্বাস্তুদের সহায়তার আশ্বাস দেন। শিলিগুড়ির সঙ্গে তাঁর এই ঐতিহাসিক যোগাযোগের কারণে এবং তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে শহরের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রধান রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে ‘শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি রোড’ (এসপি মুখার্জি রোড), যা শিলিগুড়ির প্রাণকেন্দ্র হিলকার্ট রোডের সঙ্গে এয়ারভিউ মোড় সংলগ্ন এলাকাকে যুক্ত করে। ফলে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির সঙ্গে শিলিগুড়ির বেশ ভাল যোগাযোগ যে ছিল তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।












