দুরন্ত প্রতিবেদন : ২০১৫ সালের রাজনীতির ছায়া পুনরায় দেখা মিলতে পারে এবারে। রঙে, চেহারায় আলাদা হলেও মুল সুরটি প্রায় এক। সেবার অশোক ভট্টাচার্যের ফর্মূলায় তৃণমূলের বিরুদ্ধে সর্বস্তরের মানুষকে একজোট হতে আহ্বান করা হয়েছিল। যার সফল রূপ দেখা গিয়েছিল শিলিগুড়ি মহকুমা পরিষদ নির্বাচন ও শিলিগুড়ি পুরনিগমের ভোটে। গোটা রাজ্যে ‘আগ্রাসী’ তৃণমূলের ক্ষমতাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে অশোকের ফর্মূলায় বাম দুর্গ অটুট রেখেছিল সিপিএম। যে ফর্মূলা ‘শিলিগুড়ি মডেল’ নামে আজও চর্চিত হয় গোটা বাংলায়। যার রেশ ২০১৬ সালেও ছিল। ফলে অশোক ভট্টাচার্য অপ্রতিরোধ্য তৃণমূলকে পরাস্ত করে বিধায়ক হতে পেরেছিলেন।


এবারে ঠিক অনেকটা একই ফর্মূলায় তৃণমূলের গৌতম দেব বিজেপিকে পরাস্ত করতে ঘুঁটি সাজিয়েছেন। যেভাবে বিজেপি হিংসা, বিদ্বেষ, ধর্মের রাজনীতি করে বাংলাকে বিষিয়ে দেবার চেষ্টা করছে, সেই অপচেষ্টাকে রুখে দেবার আবেদন জানিয়ে শিলিগুড়ির সমস্ত মানুষকে রাজনীতির উর্ধ্বে উঠতে আহ্বান করতে বলেছেন তিনি। অর্থ্যাৎ তাঁর এই বার্তার মধ্যেই স্পষ্ট যে, বিজেপি হারাতে সব দল বলকে জোট বেঁধে ভোট দিতে হবে। তবেই মেরুকরণের রাজনীতিকে পরাস্ত করা যাবে। এখানেই ‘শিলিগুড়ি মডেল-২’ পরিষ্কার হয়ে ওঠে। মুখে গৌতম দেব সেসব বিষয় মানতে না চাইলেও ছবি কিন্তু দ্বিতীয় শিলিগুড়ি মডেলের দিকেই ইঙ্গিত করছে। এটাও ঠিক এই মডেল কাজ করলে অবধারিত বিজেপিকে হারানো শুধু নয়, অপ্রাসঙ্গিক করে তোলা সম্ভব।
এবার দেখা যাক গৌতম দেব কি সত্যিই শিলিগুড়ি মডেলে ভোট করাতে চাইছেন? চাইলেও কি সেটা পারবেন? এই বিষয়টি স্পষ্ট বুঝতে গৌতম দেবের নিজস্ব একটি পোস্টের পোষ্টমর্টেম করা প্রয়োজন। যে ফেসবুক পোস্টটি ২১ এপ্রিল মঙ্গলবার পোস্ট করা হয়েছিল। সেখানে এমন কিছু কথা তিনি লিখেছেন, যা পরিষ্কার ভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছে বিজেপির বিরুদ্ধে সবাইকে এককাট্টা হতে হবে। চলুন দেখে নেওয়া যাক পোস্টটির কিছু কিছু অংশ—
প্রথম অংশ— ‘আমার রাজনৈতিক জীবনের ২৩ বছর কেটেছে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে। তারপর দিদির ডাকে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিই। আজ আমি ব্যথিত যে, নির্বাচনের নামে হঠাৎ করে বিজেপিতে যাওয়া একজন প্রার্থী যেভাবে আমার ফ্লেক্স, ব্যানার, হোর্ডিং ছিঁড়ে দিয়েছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবিকে বিকৃত করেছে — একে আর যাই বলা হোক, একে রাজনীতি বলা যায় না। শুধুই অসভ্যতা, কুৎসা এবং বিদ্বেষ কখনও রাজনীতি হতে পারে না। আমি বহুবার সিপিআই(এম)-এর বিরুদ্ধে লড়েছি, কিন্তু এই ধরনের সংস্কৃতি কখনও দেখিনি।’
দ্বিতীয় অংশ—‘বামপন্থী বন্ধুদের উদ্দেশে বলি —চলনে, বলনে ও মননে আমি আপনাদের অনেকটাই কাছের মানুষ। কার্ল মার্ক্সের লেখা, ফিদেল কাস্ত্রোর আন্দোলন, চে গুয়েভারার সংগ্রাম—আমাকে আজও ভাবায়। নাটকের মঞ্চে ‘রাজ রক্ত’ যেমন নাড়া দিয়েছে, তেমনই শাঁওলি মিত্রের ‘নাথবতী অনাথবৎ’ আমাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। মতের ভিন্নতা থাকলেও, অনুভূতির জায়গায় আমরা এক—এই বিশ্বাস আমি রাখি।’
তৃতীয় অংশ— ‘আজকের এই সংকটময় সময়ে আমার একটাই আবেদন— আমাকে একজন দলীয় প্রতিনিধি হিসেবে নয়, আপনাদেরই একজন মানুষ হিসেবে দেখুন। আমি শিলিগুড়ির বিধায়ক হতে চাই—কোন দলের নয়, আপনাদের সকলের। আমি স্বপ্ন দেখি— একটা পরিষ্কার, সুন্দর, মানবিক, বিজ্ঞানমনস্ক শিলিগুড়ির। যেখানে রাজনীতি মানে হবে উন্নয়ন, ঐক্য, সম্প্রীতি।’
গৌতম দেবের পোস্টের তিনটি অংশ পড়লেই পরিষ্কার হবে তিনি কীভাবে কংগ্রেস ও বামপন্থীদের কাছের করে নিয়ে এই সংকটময় পরিস্থিতিতে সকলকে পাশে চাইছেন। এখানে হয়তো ২০১৫ সালের মতো রাজনৈতিকভাবে সব দলকে আহ্বান করা হয়নি, তবে দলের কর্মী সমর্থকদের কাছে বার্তা দেওয়া হয়েছে রাজনীতির উর্ধ্বে উঠে এবারে অন্তত একজোট হতে এবং বিজেপিকে পরাস্ত করতে।

এবারে দেখার গৌতম দেবের নয়া ফর্মূলায় ‘শিলিগুড়ি মডেল-২’ সফলতার মুখ দেখতে পায় কিনা। অশোক ভট্টাচার্যরা শিলিগুড়ি মডেলের বিষয়টি আন্দোলনের আকারে নিয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু গৌতম দেব সেটা করেননি। বরং তিনি তাঁর মডেলকে আবেগের জায়গায় রেখে শহরপ্রেমী মানুষের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন। এই এই আবেদন কতটা কার্যকর হয়, সেটাই এখন দেখার।












