দার্জিলিং, দেশ-‌দুনিয়া

লোনক হ্রদ ফেটে বিধ্বস্ত সিকিম, ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন, নিখোঁজ ২৩ সেনা

অক্টোবর 4, 2023

দুরন্ত প্রতিবেদন
গ্যাংটক, ৪ অক্টোবর

লোনক হ্রদ ফেটে জলরাশি আছড়ে পড়েছে উত্তর সিকিমের চুংথাম বাঁধে। তাতে প্রবল চাপে দুমড়ে মুচড়ে গেছে বাঁধ। বাঁধ ভাঙায় আরও বিপুল জলরাশি তিস্তা নদীতে পড়ায় ভয়ংকর হয়ে ওঠে নদী। হড়পা বানের মত তৈরি হওয়ায় তিস্তা কার্যত ধ্বংসলীলা চালাতে শুরু করে। মঙ্গলবার গভীর রাত থেকে একের পর এক বড় বড় সেতু থেকে জাতীয় সড়ক, কংক্রিটের বহুতল বাড়ি সমস্ত গিলতে শুরু করে। মঙ্গন জেলার লাচেনের লোনক থেকে বিপর্যয় শুরু হয়ে এগোতে থাকে। সিংতামের সেনা ছাউনিও ভাসিয়ে নিয়ে যায়। নিখোঁজ ২৩ সেনা। সঙ্গে ৪১টি সেনা গাড়ি, প্রচুর বিস্ফোরক, অস্ত্রশস্ত্র, সেবক-‌রংপো রেলপ্রকল্পের কাজে কাজে লাগানো ডাম্পার সমস্ত ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ১৪ সেতু ও ১০ নম্বর জাতীয় সড়ক সহ একাধিক রাস্তা উধাও হয়ে যাওয়ায় গোটা ভারতের থেকে সিকিম প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আটকে পড়েন অন্তত ৭০০০ পর্যটক। এর মধ্যে ৩৬০০ পর্যটক রীতিমত বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দা হয়ে পড়েন। রাতের কয়েক ঘন্টার মধ্যে এমন ধ্বংসলীলা চলে যে সড়কপথে যাতায়াতের আর কোনও উপায় থাকে না। গোটা ঘটনায় সিকিমের মঙ্গন জেলা, গ্যাংটক জেলা, পাকিয়ং জেলা ও নামচি জেলা বিপুল ক্ষতির মুখে পড়ে। ঘটনায় উদ্বিগ্ন সিকিমের মুখ্যসচিব রাত ২টার সময়ই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যসচিব হরিকৃষ্ণ দ্বিবেদীকে ফোন করে সহযোগিতা প্রার্থনা করেছেন। পরে গোটা বিষয় জানানো হয় বাংলার মুখ্যমন্ত্রীকে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি গোটা ঘটনা জেনেই নিঁখোজ ২৩ সেনা জওয়ানের জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সরকারের পক্ষ থেকে সমস্ত রকম সাহায্যের আশ্বাস দেন। উত্তরবঙ্গের সমস্ত জেলার জেলা প্রশাসনকে বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য সতর্ক থাকার অনুরোধও করেছেন। গোটা বিষয়টি সমন্বয়ের জন্য মুখ্যসচিবকে দায়িত্ব দিয়েছেন তিনি।
ভারতীয় সেনার ত্রিশক্তি অক্ষের তরফে জানানো হয়েছে, মেঘভাঙা বৃষ্টির ফলে উত্তর সিকিমের লাচেনে অবস্থিত লোনক হ্রদের জল ফুলে ওঠে। এরপর চুংথাম জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বাঁধ ভেঙে প্রবল বেগে জল ঢুকে পড়ে তিস্তা নদীতে। ফলে মুহূর্তে তিস্তার জলস্তর প্রায় ১৫ থেকে ২০ ফুট বেড়ে যায়। তারপর শুরু হয় ধ্বংসলীলা। সিংতামের কাছে বারদাংয়ে থাকা সেনা ছাউনি ভেসে যাবার পর যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে এদিনই উদ্ধারকার্য চলশুরু হয়। এদিকে এদিনই শিলিগুড়ির পাশে গাজলডোবা তিস্তা ব্যারেজে ৩টি লাশ উদ্ধার হয়েছে। সিকিম সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, সিংতামে তিস্তার ওপরে থাকা ফুটব্রিজ, মঙ্গন জেলার চুংথাং টুং ব্রিজ, ফিদাং ব্রিজ ভেঙ্গে পড়েছে, ফিদাঙে চারটি পাকা বাড়ি ভেসে গেছে। দিকচুতে দুটি বাড়ি ভেসে গেছে। সেখানকার একটি ক্রাশার প্ল্যান্ট এবং পুরনো পুলিশ ব্যারাক ভেসে গেছে। সেখানেও চারজন নিখোঁজ আছে। সাংখালাংয়ের ফরেস্ট গেস্ট হাউস ও সরকারি কোয়ার্টার ভেসে গেছে।) নামচি জেলায় এলডি কাজি সেতু ভেসে গেছে, ইন্দ্রেণী সেতু ভেসে গেছে। সেবক-‌রংপো রেলপ্রকল্পের ৯ নম্বর সেতু ভেসে গেছে। শিলিগুড়ি সিকিম ১০ নম্বর জাতীয় সড়কের অনেকটা অংশ পুরো গায়েব। ফলে সিকিম যাবার কোনও উপায় নেই। লাভা হয়ে একটি বিকল্প রুট থাকলেও সেদিকে এদিন বিকেল বেলায় ধস নামে। কাটারে নামক স্থানে ধস পড়ায় ওই রুটও বন্ধ। যে কারণে সিকিমে হাই অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। মঙ্গন, গ্যাংটক, পাকিয়ং ও নামচি জেলার সমস্ত ধরনের স্কুল আগামী ৮ অক্টোবর পর্যন্ত ছুটি ঘোষণা করেছেন সিকিমের শিক্ষা দপ্তরের অতিরিক্ত সচিব আর তেলাং। মঙ্গন জেলার পুলিশ সুপার সোনম দেচু ও গ্যাংটকের পুলিশ সুপার তেনজিং লোডেন লেপচা উভয়ই নীচু এলাকার মানুষকে উঁচু এলাকায় সরে আসার অনুরোধ করেছেন। তবে কেউই এই পরিস্থিতির কারণ বর্ণনা করতে পারেননি।
পর্যটক আটকে পড়া নিয়েও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। হিমালয়ান হসপিটালিটি অ্যান্ড টুরিজম ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্কের সম্পাদক সম্রাট সান্যাল বলেন, ‘‌আমরা সঠিক হিসেব করতে পারছি না কত লোক আটকে আছে। কারণ সব জায়গায় যোগাযোগ করা অসম্ভব হয়ে উঠেছে। কেন্দ্র ও রাজ্যের কাছে আমরা আবেদন করছি এয়ারলিফ্‌টিংয়ের ব্যবস্থা করুন।’‌ রাজ্য ইকো টুরিজম বিভাগের চেয়ারম্যান রাজ বসু বলেন,‘আটকে পড়া পর্যটকদের সংখ্যা বলা কঠিন। পর্যটকদের সঙ্গে যোগাযোগ করাই যাচ্ছে না। তবে আমরা চেষ্টা করছি।’‌ ইস্টার্ন হিমালয়ান ট্রাভেল অ্যান্ড টুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক সন্দীপন ঘোষ জানান,‘‌শুধুমাত্র লাচুং ও লাচেনেই অন্তত ২৪০০ পর্যটক আটকে আছেন। যাদের আগামী ৬-‌৭ দিনে উদ্ধার করা সম্ভব হবে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। বাকি গ্যাংটকে থাকলেও তো তারা সড়ক পথে শিলিগুড়ি আসতে পারবেন না।

Leave the first comment