জয়িতা সরকার
মাধ্যাকর্ষণের বিপরীতে শত শত বছর ঝুলন্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে রয়েছে কারুকার্য করা এক পিলার। মেঝে থেকে বেশ খানিকটা উঁচু, তার নীচ দিয়ে অনায়াসে এপাশ -ওপাশ করছে কাগজ থেকে ওড়না সবই। কিন্তু প্রকৃতি কিংবা বিজ্ঞানের এমন ব্যতিক্রমের রহস্যাভেদ করতে ব্যর্থ হতে হয় বিদেশি ইঞ্জিনিয়ারকেও। বিজ্ঞানের কোন সূত্র মেনে এমন স্থাপত্য তৈরি হল এদেশের বুকে তা দেখতে আজও ছুটে আসেন দেশি-বিদেশি পর্যটকেরা। এমন অত্যাশ্চর্য স্থাপত্যের সাক্ষী হয়ে রয়েছে অন্ধ্রপ্রদেশের অনন্তপুরের কাছে লেপাক্ষী মন্দির। ভারতের যে কয়টি মন্দির রহস্য কিংবা অজানা তথ্যের দাবি রাখে তারমধ্যে অন্যতম লেপাক্ষীর হ্যাঙ্গিং পিলার।



আরাধ্য দেবতা বীরভদ্র, যা শিবের রুদ্র অবতার রুপ। প্রাচীনতায় মোড়া এই মন্দিরের প্রতিটি কোণে রয়েছে ঘটনার ঘনঘটা। মূল মন্দিরের নৃত্যহলের ৭০ টি স্তম্ভ বা পিলারের মধ্যে একটি কোণের দিকে রয়েছে সেই ঝুলন্ত পিলার। পাথরের ওপর নানা পৌরাণিক কাহিনীর নিখুঁত কারুকার্য। শুধু স্তম্ভ নয় শত শত বছরের পুরনো ফ্রেস্কো চোখে পড়বে মন্দিরের ছাদের দিকে তাকালেই, এত বছর পরও তারা নিজেদের রঙে উজ্জ্বল। শুরুতেই বলেছি মন্দির ও লেপাক্ষী নামটির সঙ্গে জুড়ে রয়েছে নানা গল্পকথা। তার ব্যতিক্রম হয়নি মন্দির তৈরির ক্ষেত্রেও। ১৬ শতকে বিজয়নগর সাম্রাজ্য যখন দক্ষিণে তাদের রাজ্যপাট চালাচ্ছে, সিংহাসনে অচ্যুতদেবরায়া, সে সময় অন্ধ্রপ্রদেশের পেনুকোন্ডা অঞ্চলের দায়িত্বে ছিলেন তার বিশ্বস্ত রাজকোষাধ্যক্ষ বীরুপান্না। বীরুপান্না ও তার ভাই বীরান্না বিজয়নগর স্থাপত্যের ধারায় এই মন্দির তৈরির কাজ শুরু করেন। কিন্তু রাজার কাছে খবর পৌঁছয়, তার বিশ্বস্ত বীরুপান্না রাজকোষের অর্থ তছরুপ করেছেন। মন্দির তৈরির কথা জেনেও রাজা তার শাস্তি স্বরুপ চোখ উপড়ে নেওয়ার নির্দেশ দিলে, অভিমানে আত্ম মর্যাদা রক্ষা করতে তিনি নিজেই চোখ উপড়ে নেন এবং কথিত আছে নির্মাণরত কল্যাণ মন্ডপের দিকে ছুড়ে দেন। আর তারপরেই থেমে যায় কল্যাণ মন্ডপ তৈরির কাজ, যা আজও অসমাপ্ত। স্থানীয়দের বিশ্বাস কল্যাণ মন্ডপের এক দেওয়ালে রয়েছে কালো চিহ্ন যা বীরুপান্নার সেই ঘটনার সাক্ষী।

মন্দির প্রাঙ্গনে রয়েছে এক বৃহদাকার পদচিহ্ন, যা সীতার পায়ের ছাপ বলেই সকলের বিশ্বাস। সবসময়ই সেই জায়গাটি থাকে জলে পূর্ণ। মন্দিরের আরেকটি দিকে রয়েছে একশিলায় তৈরি নাগলিঙ্গ। সেখানে খোদাই করা গণেশের মূর্তি নজর কাড়বে সহজেই। এই মন্দির আর জায়গাটির সঙ্গে যোগ রয়েছে মাইথোলজির। বাল্মিকীর রামায়ণে লেপাক্ষীর উল্লেখ রয়েছে। সীতাহরণের সময় রাবণের সঙ্গে এখানেই যুদ্ধ হয় জটায়ুর। রাবণ জটায়ুর ডানা কেটে দিলে ভূপতিত হয় সে। পরে রাম জটায়ুকে দেখতে পেলে বলে ‘লে পক্ষী’ তেলেগু ভাষায় যার অর্থ ‘ওঠো পাখি’। লোককথায় জানা যায়, জটায়ুই নাকি রামকে জানান সীতাকে নিয়ে রাবণ দক্ষিণের দিকে গিয়েছেন, এরকম নানা কাহিনী জুড়ে রয়েছে লেপাক্ষীকে ঘিরে। বর্তমানে ভারতের সিলিকন সিটি থেকে একদিনের গন্তব্য হিসেবে খুবই জনপ্রিয় স্থান এই লেপাক্ষী।

বর্তমানে পর্যটনের কথা মাথায় রেখে নতুন করে সেজে উঠেছে গোটা এলাকা। মন্দির প্রাঙ্গণে ঢোকার আগেই চোখে পড়বে মনোলিথিক নান্দী, যা ভারতের অন্যতম বৃহৎ মনোলিথিক স্থাপত্য। তার বিপরীত দিকেই রয়েছে জটায়ু থিম পার্ক। রামায়ণের কাহিনীর সঙ্গে সাজুয্য রেখে তৈরি এই পার্ক। একদিকে ঝুলন্ত পিলারের রহস্য, মন্দির তৈরির ইতিহাস, মনোলিথিক নান্দী, রামায়ণ গাঁথা সব মিলিয়ে পর্যটন মানচিত্রে বেশ খ্যাতনামা অন্ধ্রপ্রদেশের লেপাক্ষী।
লেপাক্ষী মন্দিরের অসাধারণ সব ছবিগুলি ক্যামেরাবন্দি করেছেন : কিংশুক সরকার











