কবিতা অধিকারী
শুরু হল ‘উত্তরের হাওয়া’। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা সাহিত্য আকাদেমি আয়োজিত সাহিত্য উৎসব ও লিটল ম্যাগাজিন মেলা। শিলিগুড়ি কলেজ ক্যাম্পাসে। বাংলা আকাদেমির সভাপতি ব্রাত্য বসু মেলার উদ্বোধন করে উদ্বাত্ত্ব কন্ঠে জানালেন,‘উত্তরের হাওয়া যখন আসে, সেইভাবে আসে, সে ভাসিয়ে নেয়।’ আদৌ কি ভাসল ? কবিতার পানসিতে চেপে উত্তরের কবির দল কি মেতে উঠতে পারল চড়ুইভাতিতে ? কিছু পারল না, কে বলল ? পারল বৈকি। ৪০০ কবি, লেখক, লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদক যারা সমবেত হয়েছেন, তাঁদেরও কিছু স্বপ্ন আছে। তাঁরাও নতুন কিছু সৃজনের নেশায় বুঁদ। তাঁদের কবিতাতেও মদ আছে, মায়া আছে, প্রেম আছে, প্রতিবাদ আছে, বোধ আছে, আছে বোহেমিয়ান জীবনের বর্জ্য ও ব্রহ্ম। কিন্তু এমন এক হাওয়ায় যখন মত্ত হতে পারে না ‘পাগলা ঘোড়া’ কিংবা ‘সকল বৃক্ষের চুমুক’ নিয়ে ঢুকে পড়তে পারেন না ‘মাইকেল মধুসূদন পুরস্কার’ প্রাপ্ত কবি বিজয় দে, তখন কবিতার পানসি কাহাতক ভাসতে পারে ! সে তো আটকে যায় কোথাও না কোথাও। অথবা যে সম্পাদক আকাদেমির কাছ থেকে এক যুগ আগেই নিজের পত্রিকার জন্য পুরস্কৃত হয়েছেন, সেই সম্পাদক যদি ঘরের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ না পান, তবে কিছু হাওয়া মনখারাপ করে ফিরে যেতে চায় নিম্নচাপের দেশে। ঘরের দোরে মেলা অথচ উত্তরের শক্তিশালী কবি সেবন্তী ঘোষ সেই মেলায় ছাড়পত্র পাননি। আবার এটাও তো ঠিক, সব কবিকে সব মেলাতেই ডাকতে হবে, সেটাও যুক্তিপূর্ণ নয়। যেটা পরিস্কার বুঝিয়ে বলেছেন শিলিগুড়ি মহকুমা তথ্য ও সংস্কৃতি আধিকারিক জয়ন্ত মল্লিক।

উত্তরের অলিখিত রাজধানী শহর শিলিগুড়িতে কবিতার উৎসব নিয়ে আলাদা প্রত্যাশা থাকাটাই স্বাভাবিক। এই উৎসব হতেই পারত একেবারে কবিতার মতো। কবিরা স্টলজুড়ে বসে থাকতে পারতেন শব্দ সন্ন্যাসীর মতো। কোনও দরকার ছিল না মন্ত্রীরা এসেছেন বলে স্লোগানে মুখরিত করার। রাজনৈতিক স্লোগানে কবিদের ধ্যানভঙ্গ করে হাবাগোবা বানানোর কোনও প্রয়োজন ছিল না। বরং সেটা না হলেই মুখ্যমন্ত্রী আরও মহীয়ান হয়ে উঠতে পারতেন। সার্থক হতে পারতো প্রাজ্ঞ ব্রাত্য বসুর উদার ভাবনা।
হাওয়ায় যখন মত্ত হতে পারে না ‘পাগলা ঘোড়া’ কিংবা ‘সকল বৃক্ষের চুমুক’ নিয়ে ঢুকে পড়তে পারেন না ‘মাইকেল মধুসূদন পুরস্কার’ প্রাপ্ত কবি বিজয় দে, তখন কবিতার পানসি কাহাতক ভাসতে পারে !
শিক্ষামন্ত্রী তথা বাংলা আকাদেমির সভাপতি ব্রাত্য বসু শুক্রবার তাঁর ভাষণে জানিয়েছেন,‘সৃজনশীল লেখক কবিদের তুলে ধরতে হবে। ছুটে যেতে হবে। কাছে যেতে হবে। ব্রাত্য সাহিত্য চর্চার পাশে দাঁড়াতে হবে।’ আকাদেমি সভাপতি কবিতা ও সাহিত্যকে নন্দন চত্বরে আটকে রাখতে নারাজ, তিনি নিদান দিয়েছেন, মহামানবের চত্বরে পৌঁছে যেতে। কারণ তিনি মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির ভাবনার অনুসারী। মুখ্যমন্ত্রী যে সাহিত্য সংস্কৃতির প্রকৃত পৃষ্ঠপোষক, সেটা বলতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন,‘কেবল শুনি রাতের কড়া নাড়া।... অবনী আছে কিনা জানি না। তবে উন্নয়ন আছে, ভালবাসা আছে, উষ্ণতা আছে।’ মন্ত্রীর কাছে তাই বাতিল কবিরা প্রশ্ন করছেন, ভালবাসা এত কম কেন? সবাইকে ডাকার উদারতা হারিয়ে যায় কেন? আবার অনেকে সমস্ত কিছুর উর্ধ্বে উঠে বলছেন,‘নাইবা এল ডাক। নাম যশ মঞ্চের জন্য তো কেবল কবিতা নয়। আপাতত সৃষ্টিতে থাকি। ডাক এলে দেখা যাবে তখন।’

উত্তরের হাওয়া অনুষ্ঠিত হচ্ছে ৩ বছর ধরে। প্রথম বছর জলপাইগুড়িতে, বিগত বছর কোচবিহারে এবং এবারে শিলিগুড়িতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তৃতীয়বর্ষের অনুষ্ঠানের সাক্ষী হতে মন্ত্রী ব্রাত্য বসু ছাড়াও হাজির ছিলেন শিলিগুড়ির মহানাগরিক গৌতম দেব, মন্ত্রী গোলাম রব্বানি, সাবিনা ইয়াসমিন, সত্যজিৎ বর্মন, কোচবিহার পুরসভার চেয়ারম্যান রবীন্দ্রনাথ ঘোষ, কবি সুবোধ সরকার, লেখক প্রচেত গুপ্ত, সাহিত্যিক আবুল বাশার, ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায়, সুধাংশু শেখর দে, অর্ণব সাহা, প্রসূন ভৌমিক, কামতাপুর সাহিত্য আকাদেমির সভাপতি অমিত রায়, বাংলা আকাদেমির সচিব বাসুদেব ঘোষ, দার্জিলিং জেলা তথ্য সংস্কৃতি আধিকারিক খান্ডমা ভুটিয়া, শিলিগুড়ি মহকুমা তথ্য সংস্কৃতি আধিকারিক জয়ন্ত কুমার মল্লিক, শিলিগুড়ি কলেজের অধ্যক্ষ সুজিত বসু প্রমুখ।
নাইবা এল ডাক। নাম যশ মঞ্চের জন্য তো কেবল কবিতা নয়। আপাতত সৃষ্টিতে থাকি। ডাক এলে দেখা যাবে তখন।












