উত্তর সম্পাদকীয়, সম্পাদকীয়

বাঘধারা

জুলাই 29, 2025

জয়িতা সরকার

বিপন্ন তালিকাভুক্ত শক্তি- শৌর্য – প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক জঙ্গলের ভারসাম্য রক্ষার গুরু দায়িত্ব যার কাঁধে, এমন প্রাণীর সংরক্ষণের উদ্যোগেই আজ থেকে ১৫ বছর আগে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ-এর টাইগার সামিটে আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস হিসেবে নির্দিষ্ট হয় ২৯ শে জুলাই দিনটি। রাশিয়া, ভারত সহ মোট ১৩ টি দেশ বাঘ সংরক্ষণ  এবং বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির অঙ্গীকার নিয়ে এই বিশেষ দিনটিকে আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস হিসেবে চিহ্নিত করে। এশিয়ার যে সকল দেশ বাঘেদের বিচরণভূমি, সেসব দেশে ক্রমশই কমে আসছিল এই প্রাণীর সংখ্যা। কারণ হিসেবে অবশ্যই শীর্ষে চোরা শিকারীদের দাপট, জঙ্গলের আয়তন হ্রাস থেকে বিশ্ব উষ্ণায়ন।

২০১০ সালে ভ্লাদিমির পুতিন এর উদ্যোগে শুরু হওয়া বিশ্ব বাঘ দিবসের এবছরের  ভাবনা ‘আদিবাসী এবং স্থানীয় সম্প্রদায়কে কেন্দ্র করে বাঘের ভবিষ্যত সুরক্ষিত করা।’ প্রায়শই যে খবর শিরোনামে আসে বাঘের হানায় প্রাণ হারালো শিশু, কিংবা গ্রামবাসীরা চড়াও হয়ে প্রাণ নিল বাঘের। এই দ্বন্দ্ব দূর করার নানা পরিকল্পনা এবং রূপায়ণ করাই এবারের লক্ষ্য। আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস শুধু নয়, বাঘ সংরক্ষণের উদ্যোগ ভারতবর্ষে শুরু হয় ১৯৭৩ সালের এপ্রিল থেকে টাইগার প্রজেক্টের হাত ধরে। ১৯৭২ সালের ১৮ ই নভেম্বর জাতীয় পশু হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে বেঙ্গল  টাইগার, আর পাশাপাশি বাঘ সংরক্ষণ থেকে সংখ্যা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে শুরু হয় টাইগার রিজার্ভ তৈরির কাজও।

বাঘের সংখ্যায় বিশ্বে শীর্ষ স্থানে রয়েছে ভারত। শেষ গণনা পর্যন্ত আমাদের দেশে বাঘের সংখ্যা ৩৬৮২। ভারতের প্রায় ২০টি রাজ্যে দেখা মিলবে এদের। ইতিমধ্যেই ‘টাইগার স্টেট’ হিসেবে নিজের পরিচিতি তৈরি করেছে মধ্যপ্রদেশ। কানহা- বান্ধবগড়- পেঞ্চ- সঞ্জয়দুররি- পান্নার জঙ্গল মিলিয়ে মধ্যপ্রদেশে বাঘের সংখ্যা ৭৮৫। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দ্বিতীয়, তৃতীয় স্থানে আছে কর্ণাটক – উত্তরাখন্ড। এই উত্তরাখন্ডের জিম করবেট ন্যাশনাল পার্ক ভারতের প্রথম টাইগার রিজার্ভের স্বীকৃতি পায় ১৯৭৩ সালে। বর্তমানে  দেশে মোট টাইগার রিজার্ভ এর সংখ্যা ৫৮টি। এরমধ্যে সদ্য সংযোজিত মধ্যপ্রদেশের মাধব ন্যাশনাল পার্ক।

বাঘ সংরক্ষণের ফলশ্রুতি হিসেবে বিশ্বের প্রায় ৭৫ শতাংশ বাঘ রয়েছে এদেশে। নজর রাখা হয়েছে অরণ্যের বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যের দিকে। চোরা শিকারী রুখতে নিয়োগ করা হয়েছে স্থানীয় মানুষদের। জঙ্গলকেও বাঘ সহ অন্যান্য প্রাণীদের অবাধ বিচরণের জন্য ভাগ করা হয়েছে তিনটি জোনে, কোর-বাফার- করিডোর। বাঘের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে জঙ্গল কেন্দ্রিক পর্যটন। দেশ-বিদেশ থেকে জঙ্গল প্রেমী থেকে ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফাররা ভিড় জমান এদেশের নানা জঙ্গলে। বাঘকে ঘিরে এক চূড়ান্ত উন্মাদনা রয়েছে জঙ্গলপ্রেমী মানুষদের মধ্যে। নির্দিষ্ট জঙ্গলে নির্দিষ্ট বাঘকে দেখতে ছুটে আসেন তারা। নিজস্ব শৌর্য – শক্তি-বীরত্ব দিয়ে বর্তমানে নামজাদা বাঘেদের মধ্যে রয়েছে ছোটা মটকা, ছোটি তারা। একসময় পেঞ্চের বাঘ সংখ্যা বৃদ্ধির দায়িত্ব ছিল যার কাঁধে সেই কলারওয়ালিকে দেখতেও ছুটে এসেছেন বহু বণ্যপ্রেমী মানুষ।

যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাঘ দর্শনের ধরন বদলেছে নিয়ম করে। ইতিহাস বলছে বাঘ দেখা, বন্যপ্রেম নয়, এই তো তিনশ বছর আগে পর্যন্ত বাঘ শিকারই ছিল বীরত্বের প্রতীক। তাইত ব্রিটিশ ভারতের নানা তথ্য বলছে বাঘ শিকার করা ছিল তাদের অন্যতম শখ। কেউ কেউ বছরে প্রায় ১২০০ অধিক বাঘ শিকার করেছেন এমনটাও শোনা যায়। আরও একটু পেছনে গেলে জানা যায় আকবর, জাহাঙ্গীর দু’জনেরই বাঘ শিকারের গল্প রয়েছে ইতিহাসের পাতায়।

ইতিহাস যখন এলো তখন বাঘ কবে থেকে আছে এই পৃথিবীর বুকে তা নিয়ে অবশ্যই কৌতুহল হওয়া বাঞ্ছনীয়। প্লাইস্টোসিন যুগের শেষের দিক থেকে এর চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় বলে অনুমান।
ভূতাত্ত্বিক যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাঘের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় মধ্যপ্রদেশের ভিমবেটকা পাথরের গুহায়, যা মধ্য প্রস্তর যুগের অন্যতম নিদর্শন। এমনকি মহেঞ্জোদারোর ধ্বংসাবশেষ থেকে পাওয়া সিল -এ বাঘের চিহ্ন রয়েছে। শুধুমাত্র ইতিহাস নয়, পৌরাণিক কাহিনীও বাঘের বীরত্বের কথা বলে। বাঘকে বাহন করে মা দুর্গার আরাধনা প্রচলিত আমাদের দেশে। জঙ্গলজীবনে অভিযোজিত  পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবনে পূজিত হয় বনবিবি, যার বাহন বাঘ। কেরালার সবরিমালা আয়াপ্পানও তীর-ধনুক নিয়ে বাঘের ওপর অধিষ্ঠিত। তাই যুগ – কাল পেরিয়ে বাঘ আর এইদেশ জুড়ে রয়েছে ওতপ্রোতভাবে। মনের বিশ্বাস আর পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে এর সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। শক্তির প্রতীক এই প্রাণীর সংরক্ষণে সচেতনতা বৃদ্ধিই মূল লক্ষ্য।

Leave the first comment