দুরন্ত প্রতিবেদন : ‘ঘুম আসে না কেন/ ঘুমের ওষুধ খেয়েও...’ — চলতি ডিসেম্বর মাসের ৪ তারিখেই এই আক্ষেপ নিয়ে কবিতা লিখেছিলেন তিনি। সেই কবিতা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়েও দিয়েছিলেন। তারপর মাত্র ১৭ দিনের অপেক্ষা। এরপর আর ওষুধের প্রয়োজন পড়েনি। চিরঘুমে তলিয়ে গেলেন তিনি। শিলিগুড়ির প্রবীণ সাংবাদিক, অজাতশত্রু, প্রকাশ শাসমল। শিলিগুড়ি ৩৬ নম্বর ওয়ার্ড লাগোয়া ডাবগ্রাম শান্তিনগরের স্নেহবালা ভবনে অত্যন্ত সাধারণ জীবন যাপন করতেন। আজীবন একটি সাইকেল নিয়ে গোটা শিলিগুড়ি চষে বেরিয়েছেন খবরের খোঁজে। একেবার শান্ত, বিনীত, নিরহংকারী মানুষটি আপনমনে শুধু লিখেই গেছেন। কখনও কারও থেকে বিন্দুমাত্র সুবিধা নেবার কথা ভাবেননি। সেই মানুষটি চলে গেলেন একেবারে নীরবে। তাঁর দাহকার্য শেষ হয়ে গেলেও শিলিগুড়ির কোনও সাংবাদিক টুঁ শব্দটি পাননি। তিনি রেখে গেছেন এক ছেলে ও স্ত্রী। আর রেখে গেছেন অজস্র কবিতা ও অণুগল্প। সঙ্গে রেখে গেছেন অদ্ভুত এক মায়া মাখানো স্মৃতি, যা নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের কাছে দুর্লভ এক বস্তু।


সাংবাদিক প্রকাশ চন্দ্র শাসমল শিলিগুড়ি থেকে প্রকাশিত হিন্দি দৈনিক জনপথ সমাচারে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। এই কাগজ থেকে ৫ বছর আগে অবসর নেন। অবসরের পরেই আচমকা ভেঙে পড়ে তাঁর শরীর। সোজা হয়ে দাঁড়ানো কঠিন ছিল। তারপরেও কবিতা লেখা চলত বিরামহীন। রোজ কবিতা লিখে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করতেন। কবিতাই শেষ বেলায় বেঁচে ওঠার মন্ত্র হয়ে দাঁড়ায়। কদিন আগে আচমকা ব্রেন স্ট্রোক হয়। উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর আর স্বাভাবিক হতে পারেননি। ২১ ডিসেম্বর সকালে চির ঘুমের দেশে চলে যান। তাঁর প্রয়াণের মধ্যে দিয়ে শিলিগুড়ির সাংবাদিকতার আরও একটি পর্বের সমাপ্তি হল।

প্রকাশ শাসমল পূর্ব মেদিনীপুর জেলার আলি আমজাদ চকে ১৯৬০ সালের ২ জুনে জন্মগ্রহন করেন। শিলিগুড়ি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর এখানেই স্থায়ীভাবে কাজে নিয়োজিত হন। সাতের দশক থেকে লিখছেন কবিতা। ৪৪ বছর ধরে প্রকাশ করেছেন ‘একলব্য’ নামের ট্যাবলয়েড পত্রিকা। কবিতা ও অণুগল্প মিলিয়ে অনেকগুলি বইয়ের আত্মপ্রকাশ হয়েছে তাঁর। এর মধ্যে – রঙ বদলায়, মুখোশ, বাবা, ঘুমিয়ে আছো বাল্মীকি, কথা দিলাম, অন্য রূপ, অব্যক্ত, ওরা বেঁচে থাকে ইত্যাদি। কবিতা ছাড়াও ছোটদের গল্প, ছড়া, বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ, নাটক, উপন্যাসও লিখেছেন। লিখেছেন– নবজাতক, বালাসন, হিমাচল বার্তা, সানুদেশ, যুদ্ধক্ষেত্র, বহ্নিকন্যা, সংবর্তিকা, উত্তরবাংলা পত্রিকা, সাপ্তাহিক কৈশোর, শিলিগুড়ির জানালা, অগ্নিশৈলী, বালুকা, উত্তরবঙ্গ নাট্যজগৎ, ক্রৌঞ্চী, উত্তরবঙ্গ সংবাদ, দৈনিক বসুমতী, কালান্তর, উত্তরের সারাদিন সহ বহু পত্র পত্রিকায় তিনি লেখালেখি করেছেন।














