ক্যাম্পাস, খবরাখবর, শিলিগুড়ি, সাতরঙ

‌ছাত্রদের জন্য পায়েস রাঁধলেন শিক্ষকরা, পৌষপার্বণের স্বাদ নিতে স্কুলমুখী ডিআই

জানুয়ারি 15, 2025

দুরন্ত প্রতিবেদন :‌ কথায় আছে,‘‌বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ’। পৌষপার্বণ যার অন্যতম। শীত এলেই পিঠেপুলির গন্ধে মাতোয়ারা হন আপামর বাঙালি। আর সেই পার্বণ যদি হয় স্কুলে, তবে তো কথাই নেই। সেটাই হল ‌শিলিগুড়ি বরদাকান্ত বিদ্যাপীঠের প্রাথমিক বিভাগে। সংক্রান্তির পরদিন সকালেই পড়ুয়াদের মিড ডে মিলের পাতে পড়ল নতুন চালের পায়েস। মুচমুচে মুড়ি দিয়ে সেই পায়েস চেটেপুটে খেল ৪৫০ জন ছাত্র। যেন এক অন্যরকম উৎসব। এমন আয়োজন থেকে দূরে থাকতে পারলেন না প্রাথমিকের জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শক তরুণ কুমার সরকার ও শিলিগুড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষা সংসদের চেয়ারম্যান দিলীপ কুমার রায়। সাত সকালে তাঁরাও সটান হাজির হলেন স্কুলে। পড়ুয়াদের জন্য রান্না করা পায়েস চেখে দেখলেন তাঁরাও। নিজেরাও যেন ফিরলেন স্কুলবেলায়, অনুভব করলেন শিঁকড়ের টান। এমন আয়োজন তো ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। এসব উৎসবের মধ্যেই তো জড়িয়ে থাকে আমাদের সংস্কৃতির আখর। তরুণ কুমার সরকার ও দিলীপ কুমার রায় তাই গোটা আয়োজনের সবিশেষ প্রশংসা করলেন। পাশাপাশি বার্তা দিলেন,‘‌যাতে অন্য স্কুলগুলিও এমন অভিনব ভাবনাচিন্তা করেন। তবেই তো পড়ুয়ার সঙ্গে অভিভাবকরা স্কুলের সঙ্গে একাত্ম হতে পারবেন। স্কুলে হাজিরা বাড়বে।’‌

কার এমন পরিকল্পনা?‌

গোটা পরিকল্পনাটাই শিলিগুড়ি বরদাকান্ত বিদ্যাপীঠের প্রাথমিক বিভাগের প্রধান শিক্ষক রঞ্জন শীলশর্মার। স্কুল নিয়ে নানা পরিকল্পনা তাঁর মাথায় চলতেই থাকে। কোনও শিক্ষককে দু’‌দন্ড বসতে দেন না। সর্বক্ষণ পড়ুয়াদের নিয়ে ব্যস্ত রাখেন। আর পড়ুয়াদের স্কুলমুখী করতে আয়োজন করেন নানা অনুষ্ঠানের। কখনও বসে আঁকোর মেলা বসিয়ে দেন, তো প্রচন্ড গরমে প্রতিটি ছাত্রকে উপহার দেন ফলের রসের আস্ত বোতল। মিড ডে মিল নিয়ে যেখানে অন্যসব স্কুলে হাজারো অভিযোগ, সেখানে এখানে সপ্তাহের মেনু চার্ট দেখলে মাথা চুলকাতে হবে। ডিম মাছ মাংস থেকে মরসুমী সবজি কিছুই বাদ থাকে না। সেই প্রধান শিক্ষক চাইলেন কেন স্কুলেই পড়ুয়ারা সংক্রান্তির পায়েস খেতে পারবে না!‌ যেই ভাবা সেই কাজ। সংক্রান্তির রাতে নিজেই রান্নায় নেমে পড়লেন। এগিয়ে এলেন বাকি শিক্ষকরাও। রাতভর চলল পায়েস রান্নার কাজ। আর সকাল হতেই পড়ুয়াদের লাইন করে ডাইনিং রুমে নিয়ে এসে খাওয়ালেন সানন্দে।

ছুটে এলেন ডিআই ও চেয়ারম্যান

স্কুলে পৌষপার্বণের স্বাদ পেয়ে যেমন খুশিতে আত্মহারা স্কুলের পড়ুয়ারা তেমনি এমন অভীজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত থাকতে চাননি জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শক তরুণ কুমার সরকার এবং শিলিগুড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষা সংসদের চেয়ারম্যান দিলীপ কুমার রায়। দু’‌জনেই ছুটে এলেন স্কুলে। ঘুরে দেখলেন সব আয়োজন। পড়ুয়াদের খাবারের সময়ও সমস্ত দেখলেন। ডিআই তরুণ কুমার সরকার জানান,‘‌আমরা এসে দেখলাম পৌষপার্বণের পায়েস পড়ুয়ারা মজা করে খাচ্ছে। খাওয়ার চেয়ে বেশি ছিল আনন্দ। আমরা চাইব এমন উদ্যোগ অন্যান্য স্কুলও নেবে। এমন আয়োজন একদিকে যেমন পড়ুয়াদের স্কুলমুখী রাখবে, সেই সঙ্গে আমাদের ঐতিহ্যের সঙ্গে যোগসূত্রতা বাড়বে।’‌ শিক্ষা সংসদের চেয়ারম্যান দিলীপ রায় জানান,‘‌স্কুলের আয়োজনে আমরা মোহিত। সবাই দারুণ আনন্দ করছে। সরকারি স্কুলে এমন আয়োজন হলে পড়ুয়া তো বটেই অভিভাবকদের মধ্যেও ভাল বার্তা পৌঁছবে।’

প্রধান শিক্ষক নিজে কী বললেন?‌

‌স্কুলে পৌষপার্বণের আয়োজন নিয়ে প্রধান শিক্ষক রঞ্জন শীলশর্মা জানান,‘‌মকরসংক্রান্তি কিংবা পৌষপার্বণ বাঙালিদের চিরাচরিত প্রথা। এই দিনে পিঠেপুলিতে আসক্ত থাকি আমরা। তাই স্কুলেও ব্যবস্থা করলাম। যাতে সবাই মিলে একসঙ্গে বাঙালির ঐতিহ্য পৌষপার্বণে সামিল হতে পারি। আমরাও দারুণ আনন্দ করলাম। আর এটা নতুন কিছু নয় আমাদের স্কুলে। এখানে সপ্তাহের প্রতিটি দিন আলাদা আলাদা মেনু থাকে। ডিম, পনির, বাঁধাকপির ঘন্ট থেকে মরসুমী সবজি দিয়ে নানান খাবার তৈরি করে পরিবেশন করা হয়।’
এমন আয়োজনে খুশিপড়ুয়ারাও। বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র গণেশ মন্ডল বলল,‘‌আমরা মজা করে পায়েস খেলাম। স্কুল থেকে আমরা মাঝে মাঝেই নতুন নতুন খাবার পাই। গরমের দিনে ফলের রস, গ্লুকোজ থেকে অনেক কিছু। আবার স্পেশাল ডে-‌তে উপহারও দেন স্যারেরা।’‌‌

Leave the first comment