শিলিWOOD

‌‌জুবিনের মৃত্যুতে উত্তরের চোখে জল

সেপ্টেম্বর 20, 2025

জুবিন স্মৃতিচারণে মানিক, নজরুল, উজ্জ্বল

কবিতা অধিকারী ●‌ শিলিগুড়ি

জুবিন গর্গ নেই। উথালপাথাল অসম। চোখে জল উত্তরবঙ্গের। অসমের হলেও বাংলার সঙ্গে তাঁর আত্মিক সম্পর্ক। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের প্রেমে ভাসতেন ভারতের সুরেলা গায়ক জুবিন। উত্তরের সাধারণ, অতি সাধারণ মানুষের সঙ্গেও তাঁর ভাব গড়ে উঠেছে। সেই সম্পর্ক বজায় রেখেছেন আজীবন। উত্তরের প্রতি ভালবাসা থেকেই এখানকার মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ। শিলিগুড়ি ডাবগ্রামের মানিক সরকারের সঙ্গে জুবিন গর্গের গোটা পরিবারের সুসম্পর্ক। শিলিগুড়ি এলেই জুবিন মানিকের খোঁজ করতেন। পেশায় সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার মানিক জানান,‘‌আমার সঙ্গে উনার সম্পর্ক প্রায় ২০ বছরের। আমাকে সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য জ়ুবিন অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে লড়াই পর্যন্ত করেছেন। শিলিগুড়ি এলে সবার আগে আমাকেই ফোন করতেন। বলতেন, মানিক ছাড়া জ়ুবিন অনুষ্ঠান করবে না।’‌

জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী জুবিন গর্গ


মানিক সরকার আরও জানান,‘‌শুধু আমি নই, আমার মতো অনেককে সাহায্য করেছেন। একবার আলিপুরদুয়ারে অনুষ্ঠান করতে গেলে সেখানকার আয়োজকরা আমাকে মানতে গররাজি হন, তখন জুবিন বলে দিয়েছিলেন মানিক ছাড়া আমি গাইব না।’‌ কথাগুলি বলতে বলতে চোখের জল ফেললেন মানিক বাবু।
উত্তরবঙ্গের অতি পরিচিত ইউটিউবার উজ্জ্বল বর্মন। একেবারেই অল্প বয়স। কঠোর পরিশ্রম করে নিজের একটি জায়গা করার চেষ্টা করেই চলেছে। কোচবিহারের প্রত্যন্ত এলাকার সেই উজ্জ্বলের ডাকে সাড়া দিয়ে এক মাস আগেই একটি গান গেয়েছেন ‘‌ছম্মক ছল্লো রানি’‌। সেই গানের ভিডিওগ্রাফি হয়েছে। সেখানে উজ্জ্বল কাজ করেছেন। আরও একটি গান রেকর্ডিং হয়েছে। উজ্জ্বল জানান, ৩-‌৪টি গান নিয়ে কথা হচ্ছিল। অথচ এভাবে তাঁর চলে যাওয়ায় বুকের ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে।’‌

স্কুবা ডাইভিংয়ে অসুস্থ হবার পর সমুদ্র থেকে উদ্ধার করা হচ্ছে জুবিন গর্গকে। ছবি:‌ সংগৃহীত


কোচবিহারের ভাওয়াইয়া শিল্পী নজরুল ইসলাম এদিন কথাই বলতে পারছিলেন না। তিনি সামাজিক মাধ্যমে লেখেন,‘‌‘‌আমার লেখা ও সুর করা গান ‘‌কান্দে কানাই বজেয়া রে শানাই’‌ গেয়ে বলছিলেন, এ গানটি অমর হবে দাদা। আজ তুমি এত তাড়াতাড়ি চলে যাবে, কল্পনাও করতে পারছি না।’‌ উত্তরবঙ্গের একজন ভাওয়াইয়া শিল্পীর লেখা গানে যে কণ্ঠ দিতে পারে, সেকথা অনেকে বিশ্বাসই করতে পারেননি সেসময়। তারপর থেকে গোটা উত্তরবঙ্গ জুবিনের ভক্ত হয়ে গিয়েছিল। পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিখিলেশ রায়ও এদিন বাকরোহিত হয়ে যান। এমন শোকস্তব্ধতা গোটা উত্তরবঙ্গজুড়েই।

স্কুবা ডাইভিংয়ের আগে সিঙ্গাপুরের সমুদ্রে। ছবি:‌ সংগৃহীত


৩ বছর থেকে গান গাইতে শুরু করেন জুবিন। মোট ১২টি বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারতেন। ১৯৭২ সালে মেঘালয়ের তুরা শহরে জন্ম তাঁর। পরে অসমের জোরহাটে পরিবার সহ চলে আসেন। জীবনে ৪০টি ভাষায় গান গেয়েছেন। অনুরাগ বসুর ‘‌ইয়া আলি’ গানটি গেয়ে জনপ্রিয়তার চরম শিখরে পৌঁছন। তবে বাংলাতে এমন কিছু গান গেয়েছেন, যা বাঙালিরা ভুলতে পারবেন না। তিনি নিজেও অনর্গল বাংলা বলতে পারতেন। জুবিনের এক বোনও দুর্দান্ত গাইতেন। অসমেই একবার এক অনুষ্ঠান করে ফেরার পথে দুর্ঘটনায় মারা যান। সেই শোক নিতে পারেননি জুবিন। জাতিতে ব্রাহ্মণ হলেও ছিলেন যুক্তিবাদী। ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন না। অসমে গুণমুগ্ধরা তাঁর ২০ ফুট উঁচু মূর্তি তৈরি করেছেন। এমন একজন জনপ্রিয় গায়ক সিঙ্গাপুরে স্কুবা ডাইভিং করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে মারা যান। ‌

Leave the first comment