দুরন্ত সাতদিন : বালেশ্বরে করমণ্ডল এক্সপ্রেস দুর্ঘটনার পর বছর পেরিয়েছে মাত্র। সেই স্মৃতি কাটতে না কাটতেই সোমবার (১৭ জুন, ২০২৪) দুর্ঘটনার মুখে পড়ল কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস। প্রায় একই রকম ভাবে। মালগাড়ির উপরে উঠে গেল কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস ট্রেনের দুইটি কামরা। দুড়মুস হয়েছে আরও দুটি কামরা। করমণ্ডল দুর্ঘটনার সময় পাশের লাইন দিয়ে যাওয়া তৃতীয় ট্রেন– বেঙ্গালুরু-হাওড়া সুপারফাস্ট ট্রেন বিপদ বাড়িয়েছিল। এ বার তেমন কিছু ঘটেনি। কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেসের পেছনে মালগাড়ির ধাক্কায় এখানে রাত পর্যন্ত ৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। জখম হয়েছেন অন্তত ৪৬ জন। এরা সবাই উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ ও ফাঁসিদেওয়া ব্লক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ভর্তি আছেন। ঘটনাস্থল এনজেপি লাগোয়া রাঙাপানি ও চটেরহাটের মাঝে নির্মলজোত গ্রামে। এদিন উদ্ধারকার্য চলার মধ্যেই দেশজুড়ে শুরু হয়ে যায় রাজনৈতিক তরজা। রেলে যাত্রীসুরক্ষা নিয়ে পুনরায় প্রশ্ন ওঠে।


দুর্ঘটনা বৃত্তান্ত
সোমবার সকালে শিলিগুড়িজুড়ে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি চলছিল। আগরতলা থেকে এসে কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন ছেড়েছিল নির্ধারিত সময়েই। তারপর রাঙাপানি ও চটেরহাটের মাঝে নির্মলজোতের কাছে দাঁড়িয়ে পড়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস। ৮টা ৫০ মিনিট নাগাদ আচমকা সেই লাইনেই চলে আসে একটি মালগাড়ি এবং পেছন দিকে জোর ধাক্কা মারে। ঘটনাস্থলেই মালগাড়ির চালক অনিল কুমার মারা যান। মৃত্যু হয় কাঞ্চনজঙ্ঘার গার্ড আশিস দের। যাত্রীরা আর্ত চিৎকার শুরু করেন। এরপরেই দেখা যায় কাঞ্চনজঙ্ঘার কামরা মালগাড়ির ওপর বিপজ্জনক ভাবে উঠে গেছে। ধীরে ধীরে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে শুরু করে।
দুর্ঘটনার দায়
কাঞ্চনজঙ্ঘা দুর্ঘটনার দায় আসলে কার, তাই নিয়ে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। অনেকেই বলছেন, মালগাড়ির চালক সিগন্যাল না মেনে একই লাইনে ঢুকে পড়ে। কিন্তু সেটার সত্যতা নেই। রেলেরই একটি সূত্রে আবার জানা যায়, সোমবার ভোর থেকেই রাঙাপানি এবং চটেরহাট অংশে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থা খারাপ ছিল। ওই অংশে তাই ট্রেন চলাচল হচ্ছিল ‘পেপার লাইন ক্লিয়ার টিকিট’ (পিএলসিটি) নিয়ে। সহজ ভাষায় যাকে বলে কাগুজে সিগন্যালে। রাঙাপানি স্টেশন মাস্টারের দেওয়া কাগুজে অনুমতি বা ‘টিএ ৯১২’ ফর্মে উল্লেখ ছিল কোন্ কোন্ সিগন্যাল ‘ভাঙতে’ পারবেন চালক। এমনকি, কোথা থেকে কোন্ অবধি এই ‘অনুমতি’ বহাল থাকবে, তারও উল্লেখ ছিল। কাঞ্চনজঙ্ঘার পাশাপাশি মালগাড়ির চালক ও গার্ডের কাছেও ছিল সেই ছাড়পত্র।
উল্লেখ্য, স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থা খারাপ হয়ে গেলে ওই নির্দেশের ভিত্তিতেই ট্রেন চালিয়ে থাকেন চালক। এক্ষেত্রে মালগাড়ি চালক সব নিয়ম মানছিলেন কিনা সেটাও খতিয়ে দেখার বিষয় রয়েছে।
তবে রেলবোর্ড স্বীকার করেছে, ওই লাইনে ছিল না ‘কবচ’। কবচ ভারতে তৈরি একটি প্রযুক্তি। একই লাইনে যদি দু’টি ট্রেন চলে তবে দুর্ঘটনা এড়াতে সাহায্য করে কবচ। রেল বোর্ডের চেয়ারম্যান জয়া বর্মা সিংহ একটি বেসরকারি খবরের চ্যানেলকে বলেছেন, ‘দিল্লি-গুয়াহাটি রুটে সুরক্ষা ব্যবস্থা বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে রেলের।’
ক্ষতিপূরণ
কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন মোদি। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের তরফে জানানো হয়, মৃতদের পরিবার পিছু দু’লক্ষ টাকা দেওয়া হবে। পাশাপাশি, আহতদের ৫০ হাজার টাকা সাহায্যের কথাও জানান মোদি। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে ওই ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। এরপর রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব জানান, মৃতের পরিবার পিছু ১০ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে রেলের তরফে। একই সঙ্গে গুরুতর আহতদের আড়াই লক্ষ টাকা করে এবং তুলনামূলক কম জখম হয়েছেন যাঁরা, তাঁদের ৫০ হাজার টাকা করে আর্থিক সাহায্য করা হবে।
দুর্ঘটনার জের
কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস দুর্ঘটনার জেরে বেশ কিছু ট্রেন বাতিল করে রেল। কমপক্ষে পাঁচটি ট্রেন বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই সঙ্গে বদল আনা হয় বেশ কিছু ট্রেনের গতিপথেও। যাত্রীদুর্ভোগের কথা মাথায় রেখে শিলিগুড়ি থেকে কলকাতার উদ্দেশে অতিরিক্ত বাস চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ নিগম।














