উত্তর সম্পাদকীয়

‌গজরাজ

আগস্ট 12, 2025

গজরাজ। প্রচ্ছদের ছবিগুলি বক্সার জঙ্গলে তোলা। ক্যামেরায় :‌ এ জে ঘোষ

জয়িতা সরকার

জঙ্গল থেকে যুদ্ধক্ষেত্র, রাজপথ থেকে মন্দিরের দ্বারোদঘাটন, পুরাণ থেকে ইতিহাস পাড়ি দিয়ে বর্তমান, সর্বত্র যার বিচরণভূমি, অস্তিত্ব সংকটে থাকা স্থলভাগের সর্ব বৃহৎ প্রাণী হাতিকে সংরক্ষণ সচেতনার তাগিদে ২০১২ সালের ১২ ই অগস্ট দিনটি নির্ধারিত হয় বিশ্ব হস্তি দিবস হিসেবে। যদিও এর বহু বছর আগে ১৯৯২ সাল  থেকে আমাদের দেশে প্রোজেক্ট এলিফ্যান্ট এর মাধ্যমে সংরক্ষণ শুরু হয় আই সি ইউ এন- র বিপন্নতার তালিকায় থাকা এশিয়ান এলিফ্যান্ট-এর। বাস্তুতন্ত্রের কারিগর হিসেবে পরিচিত এই প্রাণীটি জঙ্গলের জীব বৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষার কর্তা। বৃহদাকার এই প্রাণী সংকটের অন্যতম কারণ তার মূল্যবান দাঁত, যা দেশে বিদেশের বাজারে মহার্ঘ্য। আর তার জেরেই চোরা শিকারীদের কবলে পড়তে হয় এই হস্তিকূলকে। জঙ্গল বিনাশ, মানুষ হাতি দ্বন্দ্বের কারণেও অস্তিত্ব নিরাপদ নয়, তাই তো মানুষকে সজাগ করতে বিশ্বজুড়ে পালিত হয় এই দিনটি।

কানাডিয়ান ফিল্মমেকার প্যাট্রিসিয়া সিমস এবং দ্য এলিফ্যান্ট রিইন্ট্রোডাকশন ফাউন্ডেশন অফ থাইল্যান্ড এর উদ্যোগে শুরু হওয়া বিশ্ব হস্তি দিবসের এবারের ভাবনা ‘Matriarchs and Memories’. মনুষ্য সমাজের কিছু বিশেষ গোষ্ঠী বা জাতি যেমন মাতৃতান্ত্রিক কিংবা মা পরিবারের কর্ত্রী, হস্তী সমাজেও পরিবারের দায়িত্ব মায়ের। দুগ্ধপান থেকে জঙ্গলের পরিচয় সবকিছুর গুরুভার থাকে তাদের ওপর। আর এই হস্তীকূলের স্মৃতিশক্তি নিয়ে কোন অত্যুক্তি করা যায় না, মনে রাখার ক্ষমতা অত্যন্ত প্রখর। আর এই দুটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েই এবছরর এই ভাবনা।

মাতৃপতি হস্তী গোষ্ঠীর কথা বলতে হলে নাম উঠে আসে পার্বতী বড়ুয়ার।  ভারতের প্রথম মহিলা মাহুত। পুরুষ আধিপত্যে থাকা এই জীবিকার প্রথা ভেঙ্গে প্রথম পদক্ষেপ রাখেন আসাম নিবাসী পার্বতী বড়ুয়া। ছেলেবেলা থেকেই জঙ্গলের সঙ্গে রয়েছে তার নিবিড় যোগাযোগ, মাত্র ১৪ বছর বয়সে প্রথম বন্যহাতির সঙ্গে সখ্যতা গড়ে ওঠে। তার দীর্ঘজীবনে হাতির সঙ্গে এমন অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের কারণে ২০২৪ সালে দেশের অন্যতম সম্মান পদ্মশ্রীতে ভূষিত হন তিনি।

মাতৃত্বের অন্যতম নিদর্শন রেখেছে হস্তীবাহিনীর দীর্ঘজীবি ‘বৎসলা’। পান্নার জঙ্গলে ৮ ই জুলাই মৃত্যু হয় ‘দাদি মা’ নামে খ্যাত শতোর্ধ্ব হাতিটির। বয়সের ভারে নুব্জ হলেও হাতি পরিবারে নতুন সদস্য এলে তার দেখভাল দিব্যি করত সে। জঙ্গলের নিয়ম কানুন থেকে বন্যযাপনে হস্তিশাবককে পারদর্শী করার দায়িত্ব সামলাছে বহুকাল। শুধুমাত্র জঙ্গলে নয়, হাতিকূল সমানভাবে দায়িত্ববান মানব সমাজেও। ইতিহাসের পাতা বলছে কুষাণ-গুপ্ত থেকে মুঘল সবকালেই হাতিশাল ছিল পরিপূর্ণ।  ইতিহাসের অন্যতম সাক্ষী হিসেবে রয়েছে বিজয়নগর সাম্রাজ্যের বিশাল হস্তি আস্তাবল, যা বর্তমানে হাম্পির বিশেষ দর্শনীয় স্থান।  কাল সময়ের নিয়মে কর্মধারার পরিবর্তন মেনে হাতি হল কখনও জঙ্গল সাফারির বাহক, কখনও রাজকীয়তার প্রতীক, কখনও মন্দিরের বিশেষ আকর্ষণ থেকে সার্কাস সবেতেই মানুষের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে আছে এই গজবাহিনী। রাজস্থানের হোলি উৎসবে সুসজ্জিত হাতিদের উপস্থিতি নজর কাড়ে সবার। ঠিক তেমনই  দেশ বিদেশ খ্যাত মাইসোর দশেরার শোভাযাত্রার মূল আকর্ষণ এরা। কেরালার পুরম উৎসবেও এদের উপস্থিতি। থ্রিসুর পুরমে দেখা মেলে দেশের সর্ববৃহৎ ও এশিয়ায় দ্বিতীয় বৃহতের তালিকায় থাকা রামনের। উচ্চতায় ১০ ফিটের অধিক ৫৬ বছরের থেচিক্কোট্টুকাভু রামচন্দ্রন মূল আকর্ষণ। তবে তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নানা অপ্রীতিকর ঘটনাবলীও। তবুও সোশাল মিডিয়া থেকে সংবাদপত্র সবেতেই এই রামনের অবাধ বিচরণ।

বিপন্নতার তালিকায় শুধুমাত্র এশিয়ান এলিফ্যান্ট নয়, রয়েছে আফ্রিকার দুই প্রজাতির হাতিরাও। তাদের সংরক্ষণের নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও ক্রমশ জঙ্গল কমে আসায় বেড়ে চলেছে মানুষের সঙ্গে এই বণ্যপ্রাণের সংঘাত। আর তাতেই সংখ্যা কমছে প্রতিনিয়ত। সংখ্যার নিরিখে আমাদের দেশে কর্ণাটকে হাতির সংখ্যা সর্বাধিক। ২০২৩ এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৬০০০ বেশি হাতি রয়েছে এ রাজ্যে, মিলেছে রাজ্য প্রাণীর
স্বীকৃতি। তবে শুধু এরাজ্য নয়, কেরালা, ঝাড়খন্ডেও রাজ্য প্রাণী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে হাতি। দেশের প্রথম হাতি সংরক্ষণের জন্য গড়ে ওঠা রির্জাভ ফরেস্ট সিংভূম এলিফ্যান্ট রির্জাভ। যা ২০০১ সালে সংরক্ষিত করা হয়, বর্তমানে দেশে ৩৩ টি এলিফ্যান্ট রির্জাভ ফরেস্ট রয়েছে। বিপন্ন বৃহদাকার এই প্রাণীর সংখ্যা বৃদ্ধি ও সংরক্ষণই এই বিশেষ দিনের অঙ্গীকার।‌

লেখার সঙ্গে ছবিগুলি ক্যামেরাবন্দি করেছেন :‌ কিংস (‌Kings)‌‌‌

Leave the first comment