দুরন্ত প্রতিবেদন: উত্তরবঙ্গের পরিচালকের নির্দেশনায় তৈরি হয়েছে পূর্ণদৈর্ঘ্যের বাংলা বাণিজ্যিক ছায়াছবি। প্রথম তৈরি সেই সিনেমাই রীতিমত বাজিমাত করল। ‘কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’এর বেঙ্গলি প্যানোরামা বিভাগে ও ‘ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’ এর বিশ্ব চলচ্চিত্র বিভাগে মনোনয়ন পেল। যা গোটা উত্তরবঙ্গ তো বটেই, বাংলার জন্য গর্বের। আর এই কাজটি করে দেখিয়েছেন শিলিগুড়ির সন্তান অভিজিৎ শ্রীদাস। ‘বিজয়ার পরে’ নামের বাংলা সিনেমাটির প্রযোজনা যিনি করেছেন, তিনিও শিলিগুড়ির পরিচিত ব্যক্তিত্ব। সুজিত রাহা। গোটা শহরে যিনি পরিবেশ বন্ধু হিসেবেই বেশি পরিচিত। কংক্রিটের জঙ্গলে ঢেকে যেতে বসা শিলিগুড়ির প্রান্তে যিনি সবুজের শ্রীখন্ড গড়ে তুলেছেন। এই দুইয়ের দুঃসাহসে ভর করেই উত্তরবঙ্গের সৃষ্টি এবারে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে স্থান পেতে চলেছে। এই অমোঘ প্রাপ্তিতে খুশি খোদ সিনেমাটির পরিচালক ও প্রযোজকও। সুজিত রাহা তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া পেজে লিখেছেন,‘Yes,we did it.. আমরা পেরেছি। SR Jupiter Motion Pictures, Siliguri নিবেদিত প্রথম মূলধারার পূর্ণ দৈর্ঘ্যের বাংলা কাহিনীচিত্র ‘বিজয়ার পরে’ নির্বাচিত হল ‘কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’এর বেঙ্গলি প্যানোরামা বিভাগে ও ‘ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’ এর বিশ্ব চলচ্চিত্র বিভাগে। সেন্সর বোর্ডের অনুমোদন পর্বের পর ছবির চূড়ান্ত মুক্তির আগেই এই সাফল্য-সংবাদে আমরা অভিভূত। পরিচালক অভিজিৎ শ্রীদাস এর কঠোর শ্রম ও দক্ষনিষ্ঠ নিরলস প্রয়াস ও বহু বিঘ্ন অতিক্রম করে এই সাফল্যে ছবিটির নির্মাতা হিসেবে আমি অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত। অভিজিৎ শ্রীদাস, সকল স্বনামধন্য অভিনেতা অভিনেত্রী ও এই ছাযাছবিটির নির্মাণের সংশ্লিষ্ট সমস্ত সহযোগীবৃন্দকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন। একযোগে শহর শিলিগুড়ির পরিচালক ও নির্মাতা হিসেবে প্রথম মূলধারার পূর্ণ দৈর্ঘ্যের বাংলা চলচ্চিত্র নির্মাণের কাজে হাত দিয়ে প্রাথমিক পর্বে আমাদের মনে যে সুপ্ত সংশয় দানা বেঁধেছিল তার নিরসন হল ছবিটির এই সাফল্যে।’

বিজয়ার পরে সিনেমা প্রধান চরিত্রে যারা অভিনয় করেছেন, তাঁদের মধ্যে থাকা স্বস্তিকা মুখার্জি লিখেছেন,‘এই বছর কলকাতার আন্তর্জাতিক ফিল্ম উৎসবে ৭টি বাংলা ছবি রয়েছে, সবগুলি প্রথমবার/নতুন পরিচালক দ্বারা পরিচালিত। বছরের পর বছর ধরে মানুষ আমাকে জিজ্ঞেস করেছে কেন আমি সবসময় নবাগতদের সাথে কাজ করতে পছন্দ করি? হ্যাঁ সেখানে অনেক সীমাবদ্ধতা আছে, অনেক বেশি কঠোর পরিশ্রম এবং তারপর এমন আশ্চর্যজনক ফল পাই!’ পরিচালক অভিজিৎ শ্রীদাস রেডিও জকি হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। পরে তিনি এই পেশা ছেড়ে বিজ্ঞাপনী ছবি তৈরির কাজ শুরু করেন। মুম্বাইয়ে দীর্ঘ সময় এই কাজের পর ইচ্ছে হয় পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা তৈরির। কিন্তু চাইলেই তো আর হয় না। সিনেমা তৈরির জন্য অর্থের প্রয়োজন। এই সময় অভিজিতের পাশে দাঁড়ান শিলিগুড়ির আরেক পরিচিত মানুষ সুজিত রাহা। তিনি সিনেমা প্রযোজনার দায়িত্ব নেন। এরপরই শুরু হয় সিনেমার কাজ। মীর ও স্বস্তিকার যুগলবন্দিতে নির্মাণ হয় ‘বিদয়ার পরে’। সেখানে অন্যদের মধ্যে অভিনয় করেছেন মমতাশঙ্কর, দীপঙ্কর দে’র মতো অভিনেতারা। মনপ্রাণ ঢেলে কাজ করার স্বীকৃতি মিলতে শুরু করেছে শুরুতেই। উত্তরবঙ্গের কারোর হাত ধরে এই স্বীকৃতির খবর জেনে শিলিগুড়ির অধ্যাপক অমিতাভ কাঞ্জিলাল মন্তব্যে লিখেছেন,‘‘দারুণ ব্যাপার! শিলিগুড়িসহ উত্তরবঙ্গ ভূপ্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের জন্য কলকাতা এমন কি মুম্বইয়ের মূলধারার চলচ্চিত্র বা সাম্প্রতিক ও.টি.টি পরিবেশনায় ‘লোকেশন’-এর সীমাবদ্ধ মর্যাদাতেই চিহ্নিত থেকেছে !! ‘ফিল্মসিটি’ গড়ে তোলার গালভরা নানা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি তিস্তা মহানন্দার জলে ভেসে গেছে। অ্যাক্টিং স্কুল খুলে উত্তরবঙ্গের অভিনয়-প্রতিভাদের সিনেমা সিরিয়ালে চান্স পাইয়ে দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে অভিনয় শেখানোর অসাধুব্যবসা ফুলে উঠেছে। তখন প্রায় ঔপনিবেশিক শোষণে তৃতীয় বিশ্বের দেশের স্বাতন্ত্র্যের সংগ্রামের মতো এই খবর কয়েক লক্ষ ওয়াটের আলো জ্বেলে দিল বুকে !! উত্তরবঙ্গকে নিয়ে স্থানীয় শিল্পীসমন্বয়ে সিনেমা তৈরীর চেষ্টা যে আগে হয়নি তা নয়, তবে তার বিষয়বস্তু থেকে আঙ্গিক ও রূপদানের ক্ষেত্রে সীমিত চর্চিত মনন তাকে ‘শিল্পের চেষ্টা’র স্তরেই স্তিমিত রেখেছে। অস্বীকার করার উপায় নেই উপযুক্ত পরিকাঠামোর অভাব এবং অভিনয় শিল্পের সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের পেশাদারীত্বের প্রতি দায়বোধের অভাবের কারণেই এখানে চলচ্চিত্রের উপযুক্ত অভিনয় ভাষা জানা অভিনয় কর্মীর ঘাটতি আছে। কিন্তু সে ঘাটতি পূরণ হতে খুব বেশী সময় লাগবে না এমন নির্মাণের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা গেলে!! ‘বিজয়ার পরে’ চলচ্চিত্রের প্রভূত সাফল্য কামনা করি। নির্মাতা হিসেবে যে সাহস নিয়ে একজন উদীয়মান নির্দেশকের পাশে দাঁড়ানোর দৃষ্টান্ত তৈরী হল, তা অনুপ্রেরণা হয়ে উঠুক।’’ শিলিগুড়ির নাট্যজগতের প্রায় প্রতিটি মানুষ সুজিত রাহা ও অভিজিৎ শ্রীদাসের কাজকে কুর্ণিশ জানিয়েছেন।












