কবিতা অধিকারী
সুপারস্টার জুবিন গর্গের চলে যাবার শোক এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি উত্তর-পূর্ব ভারত। তার আগেই দার্জিলিং পাহাড়ের আরেক ঝংকার, পাহাড়ের হার্টথ্রুব গায়ক প্রশান্ত তামাং প্রয়াত হলেন মাত্র ৪৩ বছর বয়সে। ১১ জানুয়ারি আচমকা কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন সুপার সিঙ্গার প্রশান্ত তামাং। প্রশান্ত তামাংকে নিয়ে আবেগ যে কতটা তা ২০০৭ সালে গোটা দার্জিলিং জেলা অনুভব করেছেন। এই সুরেলাকন্ঠের আবেগে ভর করেই পাহাড়ের রাজনীতিতে বিমল গুরুং শক্ত জায়গা তৈরি করে নেন। একদিকে প্রশান্ত তামাংকে ইন্ডিয়াল আইডলে বিজেতা হিসেবে দেখতে গোটা পাহাড় কোমড় বেঁধে নামে। সেই সময় সুবাস ঘিসিংয়ের জিএনএলএফ পার্টি ভেঙে বিমল গুরুং সহ অনেকে মিলে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা গঠন করে। বিমল গুরুং গোর্খা আবেগ জাগিয়ে তুলে জিজেএমএম দলকে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রশান্তকে দারুণভাবে ব্যবহার করেন। গোটা পাহাড়ে এসটিডি বুথ খুলে দেন। যাতে ফোনে প্রশান্ত তামাংকে ভোট করা যায়। শেষে ভোটের শক্তিতেই প্রশান্ত তামাং ইন্ডিয়ান আইডলের শীর্ষে পৌঁছে যান। এর বাইরেও অজস্র ঘটনা রয়েছে সেইসময়ের।

প্রশান্ত তামাং বাবার কনস্টেবলের চাকরি পেয়েছিলেন। প্রশান্ত তামাংয়ের মাথায় ইন্ডিয়ান আইডলের শিরোপা লুঠতেই রেডিওতে একটি মন্তব্য ঘিরে ২০০৭ সালে তরাই-ডুয়ার্সে অস্থিরতার পরিবেশ তৈরি হয়। তা নিয়ে পাহাড় সমতলে প্রতিবাদও আছড়ে পড়ে। যার রেশে অনেক দূর ছড়িয়ে পড়ে। শিলিগুড়িতে প্রতিবাদ মিছিল হয়।
সেই মিছিলে প্রায় ২০০০-২৫০০ মানুষের সমাগম হয়েছিল। তাঁরা শিলিগুড়ি কাছারি রোড হয়ে এসডিও অফিসে অভিযোগপত্র দাখিল করতে যাচ্ছিলেন। তখন কেউ কটুক্তি ঘিরে করলে একরকম বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষ দানা বাঁধে। দোকান ও গাড়ি ভাঙচুর, পাথর ছোড়া ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। বাধ্য হয়ে কারফিউ জারি করতে হয়েছিল শিলিগুড়ি পুলিশ প্রশাসনকে। শিলিগুড়ির পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সিআরপিএফ মোতায়েন করা হয়েছিল। এর বাইরেও কিছু মানুষের আবেগ, উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছিল। একটা নতুন আবহ তৈরি হয় তখন। যাতে করে দার্জিলিং পাহাড়–ডুয়ার্স–তরাই অঞ্চলের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটই পাল্টে দেয়। আসলে ১৯৮০ সাল থেকে সুবাস ঘিসিংয়ের জিএনএলএফ গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের মুখ ছিল। কিন্তু প্রায় ৩ দশকেও আলাদা রাজ্যের দাবি পূরণ না হওয়ায়, পাহাড়বাসীর ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে ও প্রশান্ত তামাংয়ের আবগকে ব্যবহার করে বিমল গুরুং তেড়েফুঁড়ে ওঠেন। ২০০৭ সালেই বিমলের নেতৃত্বে GJMM তৈরি হয়।
কিন্তু ব্যক্তি প্রশান্ত এসব রাজনীতি থেকে দূরে থেকেছেন। তিনি নিজে গান ও অভিনয় নিয়েই ব্যস্ত থেকেছেন। নেপালি সিনেমায় নিজেকে দুর্দান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ধীরে ধীরে বিমল গুরুংয়ের কারিশ্মা ফ্যাকাশে হলেও প্রশান্ত তামাং নিজের চেনা পরিধির মধ্যে দিব্যি ছিলেন। রবিবার মাত্র ৪৩ বছর বয়সেই তার মৃত্যু হয়েছে। সোমবার দেহ বাগডোগরা বিমানবন্দর হয়ে দার্জিলিঙের তুংসুং নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পাহাড়েই তাঁর অন্তিমক্রিয়া সম্পন্ন হবে।












