ই-‌ম্যাগ, বই-‌কথা

‌একটি ‘‌সাদা খাতা’ এবং আগুনের ফুলকি

জানুয়ারি 8, 2026

অঞ্জন কুমার দাসের অক্ষরহীন কাব্যগ্রন্থ ‘‌এক ঝাঁক বালিহাঁস ও একটি সাদা খাতা’‌।

কবিতা অধিকারী

‘‌না বলাটাও কি কখনো কখনো প্রতিবাদ?‌ সেই প্রতিবাদ কি আলোড়ন ফেলে ?‌ বোবাও কি বুকফাটা আর্তনাদে পৃথিবীর সমস্ত অত্যাচারের বিরুদ্ধে স্বর উঁচু করতে পারে?‌’‌— আচমকা এই কথাগুলি কেন?‌ কারণ ‌২০টি কবিতার একটি সংকলন। একটি পুরোদস্তুর কাব্যগ্রন্থ। নাম ‘‌এক ঝাঁক বালিহাঁস ও একটি সাদা খাতা’। কবি অঞ্জন কুমার দাস। প্রকাশিত হয়েছে ৩১তম উত্তর দিনাজপুর বইমেলার শেষ দিন অর্থ্যাৎ ৭ জানুয়ারি সন্ধ্যায়। ইসলামপুর শহরে আয়োজিত বইমেলায় শহরের লেখক কবিরা সম্মিলিতভাবে কাব্যগ্রন্থটির মলাট উন্মোচন করেন। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হল, কাব্যগ্রন্থে ২০টি কবিতা আছে বলা হলেও প্রতিটি পৃষ্ঠাই কার্যত সাদা দেখা যাচ্ছে। অক্ষরহীন। তাহলে কবিতা কোথায়?‌ তাহলে কি এটা নিছক মজা?‌ ছ্যাবালামি?‌ বইমেলায় ট্যাঁকের পয়সা খসিয়ে আদ্যন্ত কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করা হল, অথচ সেই কবিতার বইয়ে কবিতাগুলিই অদৃশ্য। স্বাভাবিকভাবেই বিষয়টি নিয়ে মেলায় সোরগোল পড়ে গেল। কিন্তু কাব্যগ্রন্থের উৎসর্গপত্র আচমকা একটি ধাক্কা দিল। বোধের জায়গা নাড়িয়ে দিল হঠাৎ। উৎসর্গপত্রে লেখা – ‘‌রাশিয়া-‌আমেরিকার গণতন্ত্র নিয়ে কথা বলতে ভালবাসেন যাঁরা। -‌’ মুহূর্তে একটি ‘‌সাদা খাতা’ যেন অনেক কিছু বলে দিল। বলার উস্কানি দিয়ে গেল। পাঠকের সামনে আরও বহু কথা ও ঘটনা ভিড় করতে শুরু করল। বইটির সামনে খানিক নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়া কিছু মুখ ভাবনার জগতে হারিয়ে গেলেন।

উৎসর্গপত্রের পংক্তিটিই যেন অক্ষরহীন কাব্যগ্রন্থে পাঠককে দিয়ে নানা পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিবাদী লেখা লিখিয়ে নিতে শুরু করল। পরের পাতাতেই কাব্যগ্রন্থের ভূমিকা হিসেবে কিছু কথা লেখা আছে –‘‌জীবনে অলীক সম্ভাবনার মতো এক অসম্ভব আলো হল প্রেম ও বিবেক। তা অন্তর্গত প্রবাহ যে সত্যের জন্ম দেয়, সেই সত্যকে ঘিরে যে নতুন জীবন গড়ে উঠতে চায়, তা থেকেই এই অক্ষরহীন জলপদ্যগুলির জন্ম।’‌

‘‌জীবনে অলীক সম্ভাবনার মতো এক অসম্ভব আলো হল প্রেম ও বিবেক। তা অন্তর্গত প্রবাহ যে সত্যের জন্ম দেয়, সেই সত্যকে ঘিরে যে নতুন জীবন গড়ে উঠতে চায়, তা থেকেই এই অক্ষরহীন জলপদ্যগুলির জন্ম।’‌

শেষ শব্দবন্ধগুলি পড়তেই আবার ধাক্কা খেতে হল। সঙ্গে সঙ্গে গোটা বইয়ের কবিতা পড়তে গিয়ে দেখা গেল পাতার পর পাতা শুধুই সাদা পৃষ্ঠা। অক্ষরহীন। কবিকে প্রশ্ন করা হলে তিনি অকপটে জানান,‘‌গোটা দেশে, গোটা বিশ্বের দিকে তাকালে মনে হয়, সবাই চাইছে চিৎকার করে কিছু বলতে, প্রতিবাদ করতে কিন্তু কোথায় যেমন আটকে যাচ্ছি সবাই। কিছু বলতে পারছে না, লিখতে পারছে না। আমিও কি পারছি!‌ কিন্তু প্রতিবাদ নিজের মতো গোকুলে বাড়তে থাকে। এই কাব্যগ্রন্থ তারই ফুলকি হয়ে উঠুক।’‌

৩১তম উত্তর দিনাজপুর জেলা বইমেলায় সহজপাঠ পাবলিকেশনের স্টলে ‘‌সাদা খাতা’‌র আত্মপ্রকাশ। ছবি:‌ সাতদিন


‘‌এক ঝাঁক বালিহাঁস ও একটি সাদা খাতা’য় বাস্তবে কোনও কবিতা নেই। শূন্য। অথচ সেই কাব্যগ্রন্থই কীভাবে মানুষের মননকে চঞ্চল করে তুলছে। প্রতিবাদী সত্ত্বাগুলিকে ঘুমোতে দিচ্ছে না। কাব্যগ্রন্থের নামটি যখন এই বাংলার কেউ পড়ছে, তার মধ্যে চেনা দুর্নীতির গন্ধ খুঁজে পাচ্ছেন মানুষ। খুঁজে পাচ্ছেন একটি জাতিকে পঙ্গু করে দেবার ষড়যন্ত্রকে। অথচ সেসব নিয়ে আওয়াজ উঠছে না। সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা লাভাও কি একটি ফুলকির অপেক্ষায়?‌ যে ফুলকি জ্বালিয়ে দিতে পারে দেশকাল, যে চকমকি পাথরের ঘষা বয়ে নিয়ে আসতে পারে প্রবল বিদ্রোহ, কবি অঞ্জন কুমার দাস কি সেই ফুলকি, সেই ঘষাকে জাগরিত করতে একটি ক্ষুদ্র ভূমিকা নিতে চাইছেন?‌ আদৌ কি সেই উদ্দেশ্য কিছুটা হলেও প্রতিধ্বনিত হতে পারে?‌ সেটা নাইবা হল, কিন্তু কবির এই আর্তি, এই ক্ষরণকে তুচ্ছ ভাবার কারণ নেই। সাধু সাবধান।
কবি অঞ্জন কুমার দাস উত্তর দিনাজপুর জেলার ইসলামপুরের স্থায়ী বাসিন্দা। কবি হবার অভিপ্রায় নিয়ে তিনি কবিতা লেখেননি কখনও। তবে কিছু অনুভূতির মুহূর্তকে হৃদয়ের কাছে আপন করে রাখতে কবিতার নির্মাণ করেন। যেভাবে এই শব্দহীন কবিতাগুলির নির্মাণ।

Leave the first comment