কবিতা অধিকারী ● শিলিগুড়ি
জল্পনার অবসান। অবশেষে দার্জিলিং জেলা তৃণমূলের (সমতল) কোর কমিটি ঘোষণা হল। ১০ জনের কাঁধে দেওয়া হল শিলিগুড়ি তৃণমূলের সংগঠন। কোর কমিটি করা হয়েছে ৯ জনের। রয়েছেন— গৌতম দেব, রঞ্জন সরকার, পাপিয়া ঘোষ, অরুণ ঘোষ, রোমা রেশমী এক্কা, শংকর মালাকার, জ্যোতি তিরকি, আইনুল হক ও শোভা সুব্বা। সঙ্গে থাকছেন চেয়ারম্যান সঞ্জয় টিব্রেওয়াল। কোনও একক সভাপতির হাতে ছাড়া হল না শিলিগুড়ি তৃণমূলের দায়িত্ব।
এখানেই প্রশ্ন উঠেছে। কোর কমিটিই যদি করা হবে, তবে সাড়ে ৩ মাস অপেক্ষা করার কারণ কী? আগেই তো ঘোষণা করা যেত। আর যদি ঘোষণা করতে সময়ই লাগবে, তবে সভাপতি পদ থেকে পাপিয়া ঘোষকে আগেই সরিয়ে দেবার কারণ কী? অহেতুক প্রায় ১০০ দিন ক্যাপ্টেনহীন দল চলায় যতটুকু ক্ষতি হবার সেটা হয়েই গেছে। এরপর ২ আগস্ট ঘোষণা হল বটে, তবে সেটা ১০ জনের কোর কমিটি। কোনও সভাপতি পদ নেই। কেন এমনটা করল দল? এর পেছনেও কি অন্য কারণ আছে?
দশে দিক
যে কোর কমিটি হয়েছে, সেটা লক্ষ্য করলেই একটি বিষয় পরিস্কার বোঝা যাবে যে, কমিটিতে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রের অভীজ্ঞদের জায়গা দেওয়া হয়েছে। সেখানে রয়েছেন দলের ৩ জন প্রাক্তন সভাপতি। গৌতম দেব, রঞ্জন সরকার ও পাপিয়া ঘোষ। দুইজন আদিবাসী মুখ রোমা রেশমী এক্কা ও জ্যোতি তিরকি। একজন গোর্খা নেত্রী। শোভা সুব্বা। একজন প্রবীণ সংখ্যালঘু নেতা। আইনুল হক। মহকুমা পরিষদের সভাধিপতির পদ সামলানো অরুণ ঘোষ এবং শঙ্কর মালাকারের মতো পোড় খাওয়া নেতা। এই কমিটি যে রীতিমত বিধানসভা ভোটের কথা মাথায় রেখেই তৈরি করা হয়েছে সেটা পরিস্কার। ভোটে জেতার জন্য ১০ দিক যাতে নজর আন্দাজ করা যায়, তাই ১০ জনকে বাছাই করে কোর কমিটিতে নিয়ে আসা হয়েছে। অর্থ্যাৎ এটি যে সাংগঠনিক কমিটি নয়, বরং নির্বাচনী কমিটি, সেটি স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। আর শিলিগুড়ির মতো বহুভাষী, বহুজাতির জায়গায় এবার লড়াই করতে গেলে যে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবেই প্ল্যান করতে হবে, সেটা নির্ঘাৎ বুঝতে পেরেছেন রাজ্য নেতারা। তাই দার্জিলিং জেলার ক্ষেত্রে ১০ মাস আগেই নির্বাচনী কমিটি গড়ে দিলেন। যাতে ভোটের ১০ দিক অক্ষুন্ন থাকে।



এক ঢিলে দুই পাখি
শিলিগুড়ি তৃণমূলের অবিসংবাদী নেতা গৌতম দেব। কিন্তু তিনি যে সাংগঠনিক ক্ষেত্রে সফল নন, সেটা পরীক্ষীত সত্য। বরং তিনি প্রশাসনিক ক্ষেত্রেই অধিক সফল। প্রায় একই কথা রঞ্জন সরকারের ক্ষেত্রেও বলা যায়। তারপরেও শিলিগুড়িতে যখন তৃণমূল সভাপতি হিসেবে নতুন মুখ পাপিয়া ঘোষকে নিয়ে আসা হল, তখন ক্ষোভ বিক্ষোভ কম হয়নি। উল্টে পাপিয়া ঘোষের সময়ই শিলিগুড়িতে প্রথমবার পুরনিগম ও মহকুমা পরিষদ দখল হয়েছে। এটাকে ঝড়ে বক মরার মতো অনেকে মনে করলেও পাপিয়া ঘোষের অনুগামীরা সেকথা মেনে নিতে নারাজ। তাঁরা জানান, পাপিয়া ঘোষ এসে দলীয় সংগঠন চাঙ্গা করতে পেরেছিলেন। যার ফল এসেছে পুরনিগম ও মহকুমা পরিষদ ভোটে। কিন্তু ধীরে ধীরে পাপিয়া ঘোষের নেতৃত্ব নিয়েও দলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। পাপিয়া ঘোষের পরে তাহলে কে? তেমন কোনও গ্রহনযোগ্য নতুন মুখ আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। যার ফলে সব মাথাদের নিয়ে কোর কমিটি গঠিত করে দেওয়া হল। এতে ভোটের মুখে সভাপতি বিতর্ক এড়ানো গেল, কারণ যে কেউ সভাপতি হলেই বিপক্ষের লোকজন গোঁ ধরে বসে যেতেন। এতে লড়াই ভীষণ কঠিন হত। তাই এ যাবৎকালে যারা শিলিগুড়ি তৃণমূলের সংগঠন দেখেছেন, তাঁদের সবার হাতেই তুলে দেওয়া হল দায়িত্ব। যাতে করে নেতাদের দক্ষতার নমুনা দেখে নেওয়া যায়, আবার ওপর সারির নেতাদের মধ্যে পারষ্পরিক সম্পর্কও মজবুত হয়। আর যার মধ্যে দিয়ে সম্মিলীত পরিশ্রমের ফসল ঘরে তুলে পারে তৃণমূল।
এরপর ভোট পেরলেই এই কোর কমিটি মুছে স্থায়ী সভাপতি পদে কাউকে বসানো হতে পারে।



চেয়ারম্যানের বয়ান
কোর কমিটির চেয়ারম্যান সঞ্জয় টিব্রেওয়ালও কিন্তু বারেবারে বলছেন, এবারে ৪টি বিধানসভাই তাঁরা পাবেন। খুবই সুন্দর কমিটি গঠিত হয়েছে। অর্থ্যাৎ নির্বাচনকে মাথায় রেখেই এই কমিটি। সংগঠন সাজানো কিংবা শক্ত করার অভিপ্রায়ে কমিটি গঠন করা হয়নি।















