দুরন্ত প্রতিবেদন : হিন্দি সিনেমার কায়দায় পরপর গুলি চালিয়ে খুন করা হল মালদার জনপ্রিয় তৃণমূল নেতা দুলাল চন্দ্র সরকার ওরফে বাবলাকে। নিজের দোকানের সামনেই ধাওয়া করে পরপর তিনটে গুলি চালানো হয়। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি নবান্ন থেকে জানিয়েছেন, বাবলাকে খুন করা হয়েছে। ইংরেজবাজার পুরসভার ২২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিলেন বাবলা সরকার (৬২)। সেই সঙ্গে তৃণমূলের মালদা জেলার সহ-সভাপতি পদেও ছিলেন। ২জানুয়ারি বৃহস্পতিবার সকাল ১০ টা নাগাদ শুট আউটের ঘটনায় গোটা এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। গুলিবিদ্ধ তৃণমূল নেতাকে অনুগামীরা উদ্ধার করে মালদা মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে গেলেও ডাক্তাররা মৃত বলে জানিয়ে দেন। এরপরই মালদার একটা অংশে কার্যত বনধের চেহারা নেয়। দুষ্কৃতীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে বিক্ষোভ দেখান জেলা তৃণমূলের নেতাকর্মী থেকে সমর্থকেরা। বাবলা সরকার খুনের ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। এক্স হ্যান্ডেলে টুইট করে মুখ্যমন্ত্রী জানান,‘বাবলা সরকার আমার দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধা ছিলেন। আজ খুন হয়েছে। কী ভাষায় যে কথা বলব কিছু বুঝে উঠতে পারছি না। বাবলার পরিবারকে আমি সমবেদনা জানাচ্ছি। ওর স্ত্রী চৈতালি সরকার যেন মনকে শক্ত রেখে এগিয়ে চলতে পারে, ঈশ্বরের কাছে এই কামনা করছি।’ অন্যদিকে ঘটনার প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী পুলিশের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। বলেন,‘ওর উপর আগেও আক্রমণ হয়েছিল। আগে নিরাপত্তা পেত। পরে সেটা তুলে নেওয়া হয়।’ বাবলা সরকারের নিরাপত্তারক্ষী কেন তুলে নেওয়া হয়েছিল, তা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন পুলিশের বিরুদ্ধে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, রোজকার মতো এদিন সকালেও গাড়ি চেপে নিজের দোকানে ঢুকছিলেন তিনি। ঠিক সেই সময় ইংলিশবাজার পুরসভার ২২ নম্বর ওয়ার্ডের ঝলঝলিয়ার মহানন্দাপল্লী এলাকায় দোকানের কাছেই একটি মোটর বাইকে চারজন এসে তাকে গুলি করে। প্রথমে তাকে এক রাউন্ড গুলি করা হয়। প্রথম রাউন্ডের গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। এরপরই প্রাণ রক্ষার জন্য পাশের একটি দোকানে ঢুকে পড়েন বাবলা সরকার। চারজন দুষ্কৃতী তখন দোকানে ঢুকে বাবলা সরকারের ওপর তিন রাউন্ড গুলি করে। একটি গুলি মাথায় এবং দুটি শরীরে লাগে। সিসিটিভি ফুটেছে স্পষ্ট সেই ছবি দেখতে পেয়েছে পুলিশ। মুখ বেঁধে দুষ্কৃতীরা দোকানে ঢুকে একের পর এক গুলি করেছে। এরপর রক্তাক্ত অবস্থায় বাবলা সরকারকে উদ্ধার করে মালদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হলে ডাক্তাররা মৃত বলে ঘোষণা করে।
অন্যদিকে এমন মারাত্মক ঘটনার পর মুখ্যমন্ত্রী বিশেষ ব্যবস্থা করে ফিরহাদ হাকিমকে মালদায় পাঠান। পরিবারের পাশে পাঠানো হয় মন্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিনকেও। অন্যদিকে শিলিগুড়ির মেয়র গৌতম দেব মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ পেয়েই পুরনিগমের বোর্ড মিটিং ফেলে মালদার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যান। পুলিশকে বাবলা সরকারের গাড়ির চালক সুমন দাস জানিয়েছেন,‘রোজকার মতোই দাদাকে বাড়ি থেকে প্লাইউডের কারখানায় ছাড়তে গিয়েছিলাম। মহানন্দাপল্লীতে দাদার দোকানটি রয়েছে। দোকানের সামনে দাদা যখন গাড়ি থেকে বেরচ্ছিলেন তখনই বাইকে এসে চারজন দুষ্কৃতী দাদাকে গুলি করে। আমি বাঁচাতে গেলে ওরা আমাকেও বন্দুক দেখিয়ে গুলি করার ভয় দেখায়, তখন প্রাণের ভয়ে সরে যাই।’
বাবলা সরকারের গাড়ির চালক সুমন দাস জানিয়েছেন,‘রোজকার মতোই দাদাকে বাড়ি থেকে প্লাইউডের কারখানায় ছাড়তে গিয়েছিলাম। মহানন্দাপল্লীতে দাদার দোকানটি রয়েছে। দোকানের সামনে দাদা যখন গাড়ি থেকে বেরচ্ছিলেন তখনই বাইকে এসে চারজন দুষ্কৃতী দাদাকে গুলি করে। আমি বাঁচাতে গেলে ওরা আমাকেও বন্দুক দেখিয়ে গুলি করার ভয় দেখায়, তখন প্রাণের ভয়ে সরে যাই।’
মৃত বাবলা সরকারের স্ত্রী চৈতালি দেবী বলেন,‘কেন এভাবে আমার স্বামীকে খুন করা হল কিছু বুঝতে পারছি না। ২০০৭ সালে স্বামীকে একবার দুষ্কৃতীরা গুলি করে মারার চেষ্টা চালিয়েছিল। তারপর দুইজন দেহরক্ষীও নেওয়া হয়েছিল। ২০২১ সালে সেই দেহরক্ষী তুলে নেয় জেলা প্রশাসন। আজকে স্বামীর দেহরক্ষী থাকলে হয়তো ওকে হারাতাম না।’ ইংরেজবাজার পুরসভার চেয়ারম্যান তথা রাজ্য তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক কৃষ্ণেন্দু নারায়ণ চৌধুরি বলেন,‘বাবলা সরকারের রাজনৈতিক কোনও শত্রু ছিল না। এর পেছনে অন্য কিছু রহস্য থাকতে পারে। পরিকল্পিতভাবেই খুন করা হয়েছে তাকে। ভাবতেই পারছি না যে বাবলা সরকার নেই।’ তৃণমূলের মালদা জেলা সভাপতি তথা বিধায়ক আব্দুর রহিম বক্সি বলেন,‘সাত সকালে দুষ্কৃতীদের এই তান্ডব দেখে রীতিমতো অবাক হচ্ছি। ২৪ ঘন্টার মধ্যে অপরাধীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানানো হয়েছে।’ বিজেপির জেলা সাধারণ সম্পাদক অম্লান ভাদুড়ি বলেন,‘বাবলাবাবু অত্যন্ত ভাল মানুষ ছিলেন। সাধারণ মানুষের অনেক উপকার করেছেন। অথচ তারই দেহরক্ষী তুলে নেওয়া হয়েছিল। পুলিশের ভূমিকায় আমরাও অসন্তুষ্ট।’ পুলিশ সুপার প্রদীপ কুমার যাদব জানিয়েছেন,‘ঘটনাস্থল থেকে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। দুষ্কৃতীদের মুখ ঢাকা ছিল বলে চিহ্নিত করতে সমস্যা হচ্ছে। তবে গোটা এলাকায় নাকা তল্লাশি শুরু হয়েছে। আপাতত দুইজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য আটক করা হয়েছে।’












