দুরন্ত প্রতিবেদন
শিলিগুড়ি, ৫ অক্টোবর
লোনক হ্রদ ফেঁটে বিপর্যয়ের ২৪ ঘন্টা পরও আতঙ্ক কাটেনি সিকিমে। বরং তিস্তার ধ্বংসলীলার পর হাহাকার পড়ে গেছে গোটা সিকিমে। ইতিমধ্যে নিখোঁজের সংখ্যা ১০০ পেরিয়েছে। মৃত্যুর সংখ্যা ১৯। এদিকে দ্বিতীয় দিনে তিস্তার জল কিছুটা সরতেই পলির নীচ থেকে বেরিয়ে আসা শুরু করেছে কঙ্কালসার চেহারার সব গাড়ি, বাড়ি থেকে সেনা ছাউনি। তছনছ হয়ে যাওয়া উত্তর সিকিমে জল ও বিদ্যুতের লাইন না থাকায় সমস্যা আরও বেড়েছে। লাচুং ও লাচেন পুরো বিচ্ছিন্ন থাকায় সেখানে আটকে পড়া অন্তত ৩৬০০ পর্যটককে এদিন পর্যন্ত ফেরানোর কোনও ব্যবস্থাই হয়নি। সিকিমে আটকে আছে ৭০০০ পর্যটক। সিকিম সরকার একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানিয়েছে, লাচুং থেকে পর্যটক উদ্ধারের কাজ শুরু হবে ৬ অক্টোবর থেকে। অন্যদিকে আবহাওয়া প্রতিকূল হওয়ায় সিকিম রাজ্যের সমস্ত স্কুলের ছুটি ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এরই মধ্যে নিম্ন অববাহিকার পাশাপাশি ডিকচু জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নিখোঁজ এক ব্যক্তির মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে বৃহস্পতিবার। পাশাপাশি ময়নাগুড়ির দক্ষিণ ধর্মপুর এলাকা থেকে উদ্ধার হয়েছে ৭ জনের দেহ। ৬ জন পুরুষ ও একজন মহিলা। মনে করা হচ্ছে দেহগুলি সব সিকিম হড়পা বানে নিখোঁজদেরই। সিকিমের সিংতাম গোলিটারে এদিন ৫টি মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে। এরই মধ্যে সিকিমের বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে ধস পড়ে যোগাযোগ আরও রুদ্ধ হয়ে পড়েছে। সিকিমের পাকিয়ং বিমানবন্দরের দেওয়ালও ধসে যেতে শুরু করেছে। শিলিগুড়ি থেকে সিকিমগামী ১০ নম্বর জাতীয় সড়কের আরও বিস্তীর্ণ এলাকা বিপদের মধ্যে যেতে বসেছে। তিস্তার ধারে থাকা দোকান বাড়ি সমস্ত ধসে যাচ্ছে। ফলে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে বুঝে ওঠা কঠিন হচ্ছে।
ওদিকে ভারতীয় সেনার ত্রিশক্তি অক্ষের জওয়ানরা উদ্ধারকার্য চালাচ্ছেন জোরকদমে। লাচুং, চুংথাম, লাচেনেই সবচেয়ে বেশি পর্যটক ও সেনা জওয়ানদের আটকে থাকার খবর মেলায় সেখানেই সার্চিং অপারেশনে জোর দেওয়া হচ্ছে বলে সেনা সূত্রে জানানো হয়েছে। ৪১টি গাড়ি সম্পূর্ণ ভেসে গেলেও কয়েকটি গাড়ি উদ্ধার হয়েছে। সেনার তরফে জানানো হয়েছে, তাঁদের প্রচুর অস্ত্রশস্ত্রও জলের তোড়ে ভেসে গেছে। পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী প্রেম সিং তামাং এদিন উচ্চপর্যায়ের একটি বৈঠক করেন এদিন। বৈঠকে সিকিমের মুখ্যসচিব থেকে রাজ্য পুলিশের ডিজি সহ বিভিন্ন বিভাগের সচিবরা ছিলেন। সেই বৈঠক থেকে নির্দেশ জারি করে বলা হয়েছে, উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিটির মধ্যে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। যাতে মানুষ সমস্যার মধ্যে বেশিদিন না থাকে। এর সঙ্গে বিজ্ঞানী, পরিবেশবিদ, জলবিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী, হিমবাহবিজ্ঞানী এবং বাঁধ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে। যে কমিটির কাজ হবে গোটা ঘটনার কারণ খতিয়ে বের করে ভবিষ্যতের জন্য একটি কংক্রিট রোড ম্যাপ তৈরি করা। এর পাশাপাশি খাদ্যসামগ্রী মজুদের ওপর কঠোর নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার থেকে ছাঙ্গু, নাথুলার মতো গন্তব্যে যাওয়ার পারমিট বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আশ্বাস দিয়ে বলা হয়েছে খুব দ্রুত বিধ্বস্ত এলাকায় জল ও বিদ্যুতের সংযোগ করিয়ে দেওয়া হবে। এদিকে যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ থাকায় অনেকেই জরুরী কাজে বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করতে পারছেন না বলে সেনাবাহিনী স্যাটেলাইটের মাধ্যমে অন্তত যোগাযোগ করিয়ে দেবার ব্যবস্থাও করছে। তারপরেও আতঙ্ক কাটছে না। ফলে ভয় থেকে গুজব ছড়িয়ে পড়ছে নিমিষে। এদিন সিকিমে গুজব ছড়ায় চুংথামের মতো ডিকচু বাঁধেও ফাঁটল ধরেছে। পরে প্রশাসনিকভাবেই সেসবের বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে মানুষকে সতর্ক ও নিরাপদে থাকার পরামর্শ দেয়।
এদিকে সড়কপথ বন্ধ থাকায় সিকিমে যেমন শিলিগুড়ি থেকে সবজি ও অন্য সামগ্রী যাওয়া বন্ধ হয়েছে, তেমনি যাচ্ছে না জ্বালানিও। এদিন গ্যাংটকে যানবাহনে পেট্রোল ভরানোর জন্য পাম্পে ভিড় দেখা গেল। কিন্তু শহরের একটিমাত্র পাম্প ছাড়াও কোথাও পেট্রোল মজুত ছিল না। সেই খাংরি পেট্রোল পাম্পেও দুপুরের পর আর জরুরী পরিষেবার গাড়ি বাদে পেট্রোল ডিজেল দেওয়া হবে না বলে জানিয়ে দেওয়া হয়। ফলে সেখানেও সাময়িক বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। সব মিলিয়ে সিকিমে বিভিন্ন দিক থেকে সমস্যা ঘিরে ধরতে শুরু করেছে। ফলে দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক না হলে পরিস্থিতি খারাপের দিকেই যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।













