দুরন্ত প্রতিবেদন
মঙ্গন, ৭ অক্টোবর
সিকিম বিপর্যয়ে মৃত বেড়ে হল ২৭। ভেসে আসা দেহ উদ্ধারও থামেনি নিম্ন অববাবিকায়। গতকাল পর্যন্ত ২২টি দেহ ভেসে আসার খবর মিললেও এদিন জলপাইগুড়ি জেলা প্রশাসনের তরফে ২৭টি দেহের তথ্য দিয়েছে। কিন্তু তারপরও আরও অন্তত ৪টি দেহ পাওয়া গেছে বলে জানা যাচ্ছে। তার চেয়েও উদ্বেগের বিষয় হল দুদিন ধরে কপ্টার নিয়ে ঠাঁয় বসে থাকলেও সেটাকে ওড়াতে না পারায় উত্তর সিকিমের লাচেন, লাচুং ও চুংথাম থেকে পর্যটকদের উদ্ধার করতে পারছে না সেনা। একেবারে নীচু স্তরে জমে থাকা মেঘ দৃশ্যমানতা নষ্ট করে দিচ্ছে। আগামী ৩/৪ দিনে এই আবহাওয়া ঠিক হবে কিনা, সেটাও অনিশ্চিত। ফলে উদ্ধারকার্যও পিছিয়ে যাচ্ছে। তবে সেনাবাহিনীর দু’টি হেলিকপ্টার মঙ্গন হেলিপ্যাডে প্রস্তুত আছে। জানা গেছে, আরও একটি ডাবল ইঞ্জিনের হেলিকপ্টার গ্যাংটকের কাছে বুরটুক হেলিপ্যাডে রাখা আছে। এই পরিস্থিতিতে সেনা চেষ্টা করছে স্যাটেলাইট ফোনে আটকে পড়া পর্যটকদের সাহস জোগানোর। পাশাপাশি ভারতীয় সেনার ত্রিশক্তি অক্ষ রোপওয়ের মত দড়ি ঝুলিয়ে সেটায় বেয়ে বেয়ে ৭-৮ জনের একটি দল ডিজেঙ্গু হয়ে চুংথাম পৌঁছেছে। কিন্তু তাতে সেখানকার পর্যটকদের খবরাখবর জানা ছাড়া উদ্ধার করে নিয়ে আসা কঠিন। ডিজেঙ্গুতেও একটি সেতু ভেসে গেছে। ফলে সেখানে স্থানীয় মানুষের যাতায়াতও রুদ্ধ হয়ে গেছে। তবে পরিস্থিতি অনুমান করে প্রশাসনের অপেক্ষায় না থেকে ডিজেঙ্গু যুব ক্লাবের সদস্যরা পাহাড়ি বাঁশ ও দড়ি দিয়ে মাচার মতো করে ঝুলন্ত একটি সেতু তৈরি করেছে। তাতেই জরুরী যোগাযোগের কাজ চলছে। অন্যদিকে লোনক হ্রদ ফেটে তিস্তায় হড়পা বান আছড়ে পড়ায় যে সেনা ছাউনি ভেসে গিয়েছিল, তার সঙ্গে প্রচুর আগ্নেয়াস্ত্র ভেসে গেছে। এর মধ্যে মর্টার শেলের মতো ভয়ঙ্কর সব বিস্ফোরক রয়েছে। যাতে করে ইতিমধ্যে জলপাইগুড়ির দুই শিশু প্রাণ হারিয়েছে। এই বিপদ আঁচ করে সেনা ও বাংলার প্রশাসন তিস্তাপারের মানুষকে সচেতন করেছেন। এবারে তৎপরতা বাড়িয়েছে সেনাও। তিস্তার নিম্ন অববাহিকা ধরে তল্লাশি চালিয়ে সেইসব বিস্ফোরক খুঁজে নদীতেই নিস্ক্রীয় করার কাজ শুরু করেছে। সিকিমেও দুদিন ধরে যেমন কয়েকটি বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে, তেমনি সেবকের কাছেও অনুরূপ বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বিস্ফোরক নিস্ক্রীয় করা হয়েছে।

এদিকে উত্তর সিকিমের লাচুং, লাচেনের মতো যেখানে পর্যটক আটকে আছেন, সেখানে উদ্ধার কাজ শুরু করা না গেলেও চেষ্টা হয়েছে কোনওভাবে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া যায় কিনা। কারণ বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা ওইসব এলাকায় ভাঁড়ারে টান পড়তে শুরু করছে। এরই মধ্যে সিকিমের আরও একটি হ্রদ ‘সাকো-চু’ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের অনেকের মতে সেখানেও জমে থাকা বরফের আয়তন বেড়েছে।
এদিকে এদিনও সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী প্রেম সিং তামাং দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেন। যান মঙ্গনেও। মূলত ক্ষতির পরিমাণ বুঝতেই এই পরিদর্শন বলে তিনি জানান। বলেন, কোথায় কত মানুষ আশ্রয়হীন হয়েছেন, কোথায় তাদের রাখা যেতে পারে। কীভাবে তাদের পাশে দাঁড়ানো যায়, সেসব নিয়ে পরিকল্পনা তৈরি করার জন্যই নিজেই ঘুরছি।’ মুখ্যমন্ত্রীর মতো স্থানীয় মন্ত্রীরাও এলাকায় নেমে পড়েছেন। পলির কেটে বাসস্থান খুঁড়ে বের করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। আর এই কাজ করতে গিয়ে এদিন সিকিমেও লাশ খুঁজে পাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। একইসঙ্গে ধসে আটকে পড়া রাস্তা পরিস্কার করে যতটা সম্ভব পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে পরশু পর্যটকদের সিকিমে যাওয়া বারণ করলেও সরকারের তরফে বিবৃতি পাল্টে দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী নিজেই দক্ষিণ ও পশ্চিম সিকিমে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন পর্যটকদের।
তবে সিকিমের বর্তমান পরিস্থিতিতে আর কেউ সেখানে থাকতে চাইছে না। পূর্ব সিকিম থেকে বেশিরভাগ পর্যটক শিলিগুড়িতে নেমে এসেছেন। পর্যটকদের সহযোগিতা করতে শিলিগুড়ি জলপাইগুড়ি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এসজেডিএ), উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহন নিগম, শিলিগুড়ি মহকুমা পরিষদ সহ অনেকেই হেল্প ডেস্ক খুলেছে। শিলিগুড়ি পুলিশের তরফেও বিভিন্ন রুট প্রকাশ করে পর্যটকদের সহযোগিতা করা হচ্ছে। জিটিএ’র তরফেও ক্রমাগত যোগাযোগ চালানো হচ্ছে সিকিম সরকারের সঙ্গে। পাশাপাশি পর্যটকদের সহযোগিতার জন্য বিনামূল্যে বাসের ব্যবস্থাও করছে। এসবের জন্য জিটিএ হেল্পলাইন নম্বর চালু করেছে। ৯৫৯৩৩৬৭৭, ৬২৯৪৫৩০৯৫০ ও ৮৯১৮৫২৫২৬২।












