দুরন্ত প্রতিবেদন
শিলিগুড়ি, ৬ অক্টোবর
হ্রদ ফেটে বিধ্বস্ত সিকিমে মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। নিখোঁজদের খুঁজতে সেনা নামালো মাউন্টেন ডগ। অন্যদিকে তিস্তার ভাটিতে একের পর এক ভেসে আসা শুরু করেছে দেহ। অন্যদিকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা লাচেন ও লাচুং থেকে পর্যটককে উদ্ধারের দিনক্ষণ ঠিক থাকলেও এদিন সেই কাজই শুরু করতে পারল না সেনা ও সিকিম পর্যটন বিভাগ। আবহাওয়া এতটাই খারাপ ছিল যে দৃশ্যমানতা কম হওয়ায় হেলিকপ্টার ওড়ানোর সাহসই দেখাতে পারেনি সেনা। অন্যদিকে স্বস্তির খবর হল গ্যাংটক থেকে পর্যটকদের বিকল্প পথে নামিয়ে আনার ব্যবস্থা করেছে। সিকিম পরিবহন দপ্তর বিজ্ঞপ্তি জারি করে তিনটি বিকল্প রুটের কথা জানিয়ে দেওয়ার পর অনেক পর্যটক গ্যাংটক থেকে নামতে শুরু করেছে। তবে লোনক হ্রদ ফেটে ভয়ংকর হয়ে ওঠা তিস্তা যেভাবে সিকিমকে বিধ্বস্ত করেছে, সেই ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে কতদিন সময় লাগবে সেটা জানাতে পারছে না সিকিম সরকার। এদিন বিকেল পর্যন্ত সিকিমের বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তর ২৫ জনের মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করেছে। নিখোঁজ রয়েছে ১৪৩ জনের কাছাকাছি। উদ্ধার করা হয়েছে ২৪১৩ জনকে। দুর্গত মানুষের সংখ্যা ২৫১০০ জনের মত। এদিন পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনের তরফে ২২ মৃতের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। যে দেহ গুলি তিস্তার জলে ভেসে এসেছে এখানে। এর মধ্যে ৪ জন সেনা জওয়ান। সিকিম সরকারের তরফে বলা হয়েছে সিকিম বিপর্যয়ে যে ২৩ সেনা জওয়ান নিঁখোজ হয়েছিল। তার মধ্যে ১ জনকে পরদিনই উদ্ধার করা সম্ভব হয়। তিনি আপাতত চিকিৎসাধীন। বাকি মোট ৬ জনের দেহ উদ্ধার হয়েছে। অন্যদিকে যেভাবে হড়পা বান সব ভাসিয়ে নিয়ে গেছে, তাতে আরও অনেক মানুষ তিস্তার পলির নীচে চাপা থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সেই সব নিখোঁজদের খুঁজতে এদিন ‘মাউন্টেন ডগ’ নামানো হয়েছে। সেনা এই খোঁজ চালানোর জন্য টিএমআর (তিরাঙ্গা মাউন্টেন রেসকিউ) এর সহায়তা নিচ্ছে। ভারতীয় সেনার ত্রিশক্তি অক্ষ লাচেন, লাচুং এবং চুংথাং এলাকায় থাকা প্রায় ১৪৭১ পর্যটকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টাও চালিয়এ যাচ্ছে। এদিকে পরিস্থিতি সরেজমিনে খতিয়ে দেখতে এদিন দুর্গত এলাকায় স্বয়ং সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী প্রেম সিং তামাং পরিদর্শনে আসেন। তিনি বিপর্যয়ের বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে আগের সরকারের বিরুদ্ধে আঙ্গুল তোলেন। বলেন,‘চুংথাম বাঁধ ভেঙে যাওয়ার কারণে পাহাড়ের নীচের দিকে বসতি এলাকায় বিপর্যয় নেমে আসে। মেঘভাঙা বৃষ্টির জন্যই লোনক হ্রদ ফেটে এমন পর্যায়ে গেছে। এত বিপুল জলরাশি চাপ বাঁধ ধরে রাখতে পারেনি। কারণ, বাঁধে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার হয়েছে।’ কার্যত এই কাজের জন্য তিনি আগের চামলিং সরকারের দিকেই অভিযোগের আঙুল তুলেছেন। চুংথাম বাঁধ লাগোয়া এলাকা যে তছনছ হয়ে গেছে সেটা তিনি জানিয়ে ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলেন। যা দিয়ে মৃত ও ক্ষতিগ্রস্থদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। ইতিমধ্যে ১৪টি গুরুত্বপূর্ণ সেতু ভেসে গেছে বলেও তিনি জানান। পাশাপাশি তিনি জানান,‘আটকে থাকা পর্যটকদের উদ্ধার করাই আমাদের এখন প্রথম লক্ষ্য। আমরা একটি বিশেষজ্ঞ দল গঠনের কথা বলেছি। সেই কমিটির দেওয়া তথ্য মেনে পরবর্তীতে কাজ হবে।’
অন্যদিকে সিকিমে আগামী ১৫ অক্টোবর পিএসসি নিয়োগ সংক্রান্ত পরীক্ষা ছিল। সেই পরীক্ষা বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। সেইসঙ্গে সিকিম সরকার চাইছে এই গ্যাংটক কিংবা আশপাশে যে পর্যটক রয়েছে, তারা যেন ফিরে যান। এর জন্য পূর্ব সিকিমের গ্যাংটক-পেডং-আলগাড়া-লাভা-গরুবাথান-গজলডোবা হয়ে শিলিগুড়ি, পশ্চিম সিকিমের নামচি-রাবাংলা-পেলিং হয়ে দার্জিলিঙের সিংলা বাজার দিয়ে সমতলে নামার রুট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। শিলিগুড়ি-সেবক-গরুবাথান-লাভা-মানসং-রংপো-গ্যাংটক রুটের কথাও বলা হয়েছে ছোট গাড়ির জন্য। ইতিমধ্যে এইসব রুট দিয়ে পর্যটকরা নামা শুরু করেছেন। উত্তরবঙ্গের পর্যটন দপ্তরের ডেপুটি ডিরেক্টর জ্যোতি ঘোষ বলেন,‘রাজ্য সরকারের হয়ে সিকিম সরকারের সঙ্গে সব সময় যোগাযোগ চলছে। সিকিম থেকে জানানো হয়েছে পর্যটকরা সবাই সুরক্ষিত।’ হিমালয়ান হসপিটালিটি অ্যান্ড টুরিজম ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্কের সম্পাদক সম্রাট সান্যাল জানান,‘সিকিমের পরিস্থিতি নিয়ে আলাদা কিছু বলার নেই। এদিন কপ্টার না ওড়ায় আমাদের উদ্বেগ থেকেই গেল। আশা করছি শনিবার উদ্ধার কাজ শুরু হবে।’ ইস্টার্ন হিমালয়া ট্রাভেল অ্যান্ড টুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক সন্দীপন ঘোষ জানান, আমরা এদিন সিকিমের সঙ্গে সবরকম ভাবে যোগাযোগ করেছি। পর্যটকদের নিয়ে কথা বলেছি। আমাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে যে চিন্তার কারণ নেই। ইতিমধ্যে উত্তর সিকিম বাদে বাকি এলাকার পর্যটক অনেকেই নেমে এসেছেন।’













