শুভজিৎ বোস
নকশালবাড়িকে আঁকড়ে রাখে খেমচি, বাতারিয়া আর মেচী নদী। হাওয়া দেয় টুকরিয়া বনাঞ্চল। মায়াবী হয়ে ওঠে নকশালবাড়ি। সেখানে কালো মাথার কাস্তেচরা পাখিরা আসে। আর সেই পাখির জন্য আসে প্রচুর পর্যটক। শুধু কী কাস্তেচরা ! সঙ্গে শামুকখোল, বাজকা, বক, মদনটাক পাখিদের আস্তানা এই মনোরম নকশালবাড়ি। বিপন্ন প্রজাতির পাখির মধ্যে পড়ে কালো মাথার কাস্তেচরা। যাকে স্থানীয় ভাষায় ‘কাকরোল’ বলা হয়ে থাকে। জুন মাসের সমীক্ষায় অনেকসংখ্যক বাসাও পরিলক্ষিত হয়েছে। তবে পর্যবেক্ষণ করে দেখা গিয়েছে ব্ল্যাক হেডেড আইবিস, ওপেন বিল স্টরক্, লেসের অ্যাডজ্যানটেন্ট স্টরক্, ক্যাটেল এগরেট, স্মল এগরেট ও নাইট হেরন প্রজাতির পাখিগুলির মধ্যে শুধু ওপেন বিল স্টরক-এর বাসা পরিলক্ষিত হয়নি এখানে। তবে এই ব্ল্যাক হেডেড আইবিস ১৯৯০ সালের পূর্বে এই এলাকায় দেখা যেত না। এই পরিযায়ী পাখিরা সাধারণত ছোট সাপ, কীটপতঙ্গ, মাছ খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করে থাকে। এলাকার কৃষিজমি, পতিত জমি, পুকুর, বট ও অশ্বত্থ গাছ এবং ঘন বয়স্ক গাছের পরিবেশ এদের বসবসারের জন্য উপযুক্ত। এখানকার পরিবেশ ওদের ভীষণরকমভাবে আকৃষ্ট করে। তবে নগরায়নের ধাক্কায় প্রকৃতির গায়ে লোহার কুঠার চালিয়ে যে নিকৃষ্ট পাপ করছে সভ্যতা তাতে পাখিরা আজ সর্বত্র বিভ্রান্ত! পথ ভুলে যাচ্ছে ওরা বাসায় ফেরার। এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। গাছ কিছু হলেও যেন রক্ষা পায়। কারণ এই লুপ্তপ্রায় পাখিরা বড় গাছগুলিতেই তাদের বাসা তৈরী করে। ইতিমধ্যে পানিঘাটা রোডে অনেকগুলি গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেছে, যার ফলে তারা আর সেখানে বাসা তৈরী করতে পারছে না। গ্রামের দিকেও বড় গাছের সংখ্যা হু হু করে কমে যাচ্ছে। বড় গাছ বেড়েই উঠছে না, অথবা অল্প বেড়ে উঠলেই কাটা পড়ে যাচ্ছে কোনও ভাবে। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের উচিৎ যে ধরণের গাছগুলিতে এই পাখিগুলি বাসা তৈরী করে যেমন- বট, অশ্বত্থ, জারুলও জঙ্গলে রোপন করা উচিৎ একথাই বললেন বিজ্ঞানক্লাবের কর্মী প্রাণগোবিন্দ নাগ, অভিজিৎ সরকার প্রমুখ। পরিযায়ী পাখিগুলির বর্ষা ঋতুর আগে আগমন ঘটে এবং সেপ্টেম্বরের দিকে বাচ্চা ফুটিয়ে ওরা উড়ে চলে যায় দূরে। এমাসের যৌথ গণনাতে ছয়টি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ঐরাবত, ওয়াইল্ড গ্যালারি, বার্ড ওয়াচার সোসাইটি, অপ্টোপিক, শিলিগুড়ি ফটোগ্রাফার সোস্যাইটি ও নকশালবাড়ি বিজ্ঞান ক্লাব অংশগ্রহণ করে। যেহেতু বড় গাছের সংখ্যা নকশালবাড়িতে কমছে, তাই যদি টুকরিয়া বনাঞ্চল এবং লঘু বসতিপূর্ণ এলাকায় সে ধরণের গাছগুলিকে সংরক্ষণ করা যায়, বা সে ধরণের গাছ রোপন করা যায় তাহলেই এই সীমিত সংখ্যায় টিকে থাকা উত্তরের গর্ব এই পক্ষীসম্পদকে রক্ষা করা যাবে,নয়তো বৃক্ষের সাথে সাথে এদেরও অস্তিত্ত্ব আর টিকিয়ে রাখা সম্ভবপর হবে না !
যদি নকশালবাড়ির ফুসফুস টুকরিয়া বনাঞ্চলেও এই স্থানীয় পরিযায়ী পাখিদের যথোপযুক্ত থাকা ও খাদ্য সংগ্রহের পরিবেশ সৃষ্টি করা যায় তাহলে অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে এলাকার পরিবেশ-বৈচিত্র্য ও গুরুত্ব। তবে টুকরিয়া ফরেস্টকে ঘিরে উত্তরের মানুষ বরাবরই স্বপ্ন দেখে পর্যটনের, যার ১৩০০ একর এলাকাজুড়ে এই বনাঞ্চল বিস্তৃত, যা ১৯৯৬ সালে ফরেস্ট রেঞ্জ হিসাবে ঘোষিত হয়। বাঁদর, হনুমান, খরগোশ, হাতি, ময়ূর, সাপ, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি এই এলাকার জৈববৈচিত্র্য রক্ষা করে। টুকরিয়ার আশেপাশেই অবস্থিত লোহাগর, পুটুং, দুধিয়া, পানিঘাটা স্পট। এলাকায় অবশিষ্ট পরিত্যক্ত জমিতে হোমস্টে, রিসোর্ট এবং পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনাকে মাথায় রেখে পরিকল্পনা নিলে সবদিক রক্ষা পাবে বলেই মনে হয়।
লেখক: নকশালবাড়ি বেঙ্গাইজোত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক




