গল্প

তেঁতুলগাছের ব্রহ্মদত্যি /চণ্ডীচরণ দাস

অক্টোবর 17, 2023


ব্যোমকেশ আর ভোলানাথ দুই সমবয়সী প্রাণের বন্ধু। পড়াশোনায় অষ্টরম্ভা, খাওয়াদাওয়া আর ঘুমানোর সময়টুকু ছাড়া পারতপক্ষে ঘরের তলায় থাকে না৷ তাদের বদমায়েশির ঠেলায় সকলে অতিষ্ঠ। ব্যোমকেশের ‘কেশ’ আর ভোলানাথের ‘নাথ’ বাদ দিয়ে সকলে দুই সাঙাৎকে তামাশা করে ডাকে ‘ব্যোমভোলা’ বলে৷
একদিন মণ্ডলদের জমি থেকে আঁখ ভেঙে চিবোতে চিবোতে ব্যোমভোলে আসছিল বিশ্বাসপুকুরের পাড় দিয়ে৷ হঠাৎ নজরে পড়ল কালীগুণীন ধোপদুরস্ত জামা পরে হাতে জড়িবুটির ব্যাগ ঝুলিয়ে মাথা নেড়ে গুনগুন করতে করতে আসছে৷ ব্যোম কনুইয়ের ঠেলা মেরে ঈশারায় ভোলাকে ফিসফিস করে বলল, “ঐ দেখ, কোথাও ভূত ছাড়াতে গিয়েছিল বোধহয়। মোটা কামাই হয়েছে, দিলদরিয়া মেজাজে বাড়ী ফিরছে৷”
ভোলা মুখের ঝিবড়েটা ‘থু’ করে ফেলে দিয়ে বলল, “ব্যাটা মহা পাজী৷ আমাকে দেখতে পারে না একদম৷ সেদিন বললাম, ‘দাদু, আমাকে তোমার চেলা করে নেবে, একটু ঝাড়ফুঁক, ভূত তাড়ানো শিখিয়ে দেবে?’ বলল কী জানিস?”
“কী?”
“বলে, ‘ডেঁপো কোথাকার! কাজ নেই কম্ম নেই, বাপের অন্ন ধ্বংস করছিস আর টো-টো করে ঘুরে বেড়াচ্ছিস৷ একটু লেখাপড়ায় মন দে, ভবিষ্যতে কাজে লাগবে৷’ সেই থেকে আমাকে দেখতে পেলেই উল্টোপাল্টা কথা বলে৷”
ব্যোম বলে উঠল, “একদিন টিউশানি যাবার সময় আমাকে কী বলে জানিস? বলে ‘বুড়ো বয়সে শিং ভেঙে বাছুরের দলে না মিশে একটু তো চাষের কাজ করতে পারিস, বাপের দু’টো পয়সা বাঁচে৷’ ব্যাটা মহা সেয়ানা৷”
“ঠিক বলেছিস, ওর একটু শিক্ষা হওয়া দরকার৷” বলে দু’জনে কালীগুণীনকে দেখেও না দেখার ভান করে উল্টোদিকে মুখ ঘুরিয়ে চুপচাপ চলে গেল৷ কালীগুণীন ব্যাপারটা বুঝল, কিন্তু মুখে কিছু বলল না৷

(২)

শীতের দিন৷ অনেকটা বেলা উঠে গেলেও কুয়াশার চাদর এখনো ঠিকমত সরেনি৷ কালীগুণীন গোয়াল থেকে গরু বের করছিল৷ হঠাৎ ভোলার মাকে তার দিকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসতে দেখে আশ্চর্য হল৷ জিজ্ঞেস করল, “কিগো বৌমা, কী হয়েছে, এমন করে ছুটছ কেন?”
“কাকা, তাড়াতাড়ি একবার আমাদের ওখানে চল৷ ঘুম থেকে ওঠা ইস্তক ভোলাটা কেমন যেন করছে। চোখ কটমট করে দেখছে, দাঁত খিঁচিয়ে কামড়াতে আসছে, লম্ফঝম্প করছে, ভুলভাল বকছে, বোধ হয় ভূতে ধরেছে৷”
কালী গাইটাকে খড়ের আঁটি খুলে দিতে দিতে বলল, “এ তো হবারই ছিল৷ সারাদিন বনেবাদাড়ে ঘুরে বেড়ালে এরকম তো হবেই৷ কোথায় কোন ভূত ব্রহ্মদত্যি গাছে বসে ছিল, সুযোগ বুঝে ঘাড়ে চেপে বসেছে৷ এবার সহজে নামলে হয়৷”
ভূত-ব্রহ্মদত্যির নাম শুনে ভোলার মা তো ভয়ে কঁকিয়ে উঠল৷ কালীর পায়ে ধরে কেঁদে কেঁদে বলল, “কাকা, এক্ষুনি চল তুমি, আমার ছেলেটাকে বাঁচাও৷
জামাটা গায়ে গলিয়ে হাতে গুণিনী সরঞ্জামের ব্যাগ নিয়ে কালী বেরিয়ে পড়ল৷ ভোলাদের ঘরে এসে দেখে ঘরে পাড়ার অনেকে জড়ো হয়েছে৷ ভোলার হাত দু’টো দড়ি দিয়ে বাঁধা৷ দুয়ারের এক কোণে বসে বসে বাবার দিকে তাকিয়ে রাগে গরগর করতে করতে ভারি গলায় বলছে, “সবকটাকে ঘাড় মটকে খাব, একটাকেও ছাড়ব না৷”
কালী কাছে যেতেই চোখ কটমট করে তার দিকে তাকাল৷
“কিরে ভোলা, কী হয়েছে তোর?”
“কে ভোলা? আমার সাথে ইয়ারকি করছিস? আমাকে তাড়াতে এসেছিস? তোর মত ঢের গুণীন দেখেছি, আমার কিচ্ছু করতে পারবি না। তোকে তোর পোঁটলাসুদ্ধ উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে তেঁতুলগাছের টঙে চারপাক ঘুরিয়ে ওই বিশ্বাসদের এঁদো পুকুরে ডুবিয়ে মারব৷” বলে মুখ বাড়িয়ে ‘হাঁউ’ করে কামড়াতে এল৷
কালী খানিকক্ষণ তার রকম-সকম দেখল৷ তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভোলার বাবাকে বলল, “খুব সিরিয়াস ব্যাপার। ভোলাকে তেঁতুলগাছের ব্রহ্মদত্যিটা ধরেছে৷ অনেক কাঠখড় পোয়াতে হবে, পাক্কা দু’টি হাজার লাগবে, তার কমে পারব না৷”
ভোলার মা কেঁদে উঠল, “তুমি যা চাও নিও কাকা, আমার ছেলেটাকে বাঁচাও, ওর ঘাড় থেকে এই ব্রহ্মদত্যিটাকে নামাও৷”
“ঠিক আছে, ভেবো না, সব ঠিক হয়ে যাবে৷”
পাড়ার বাচ্চা-বুড়ো সব ভীড় করে এসেছিল, কালী তাদেরকে সরে যেতে বলল৷ হঠাৎ তাদের মধ্যে ব্যোমকেশকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসতে দেখে চোখ কটমট করে তাকিয়ে কালী বলে উঠল, “ছেলেটার এই অবস্থা, আর তোর এখন দাঁত বের করে মস্করা হচ্ছে? যা ভাগ!” ব্যোম মুখ টিপে হাসতে হাসতে সরে গেল৷
এরপর কালী তার গুণিনী কাজকর্ম শুরু করল৷ ঘটিতে জল নিয়ে মন্ত্র পড়ে প্রথমে নিজের দেহবন্দ দিল, তারপর ঘরের চারদিকে ঘুরে ঘুরে ঘরবন্দ দিল। শেষে তেল, সিঁদুর, ফুল, তিল, ঝাঁটা, ইত্যাদি নানারকম জিনিস নিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কখনো ভোলার দিকে তাকিয়ে, কখনো বা চোখ বন্ধ করে বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি সহযোগে মন্ত্র আওড়াতে লাগল৷
প্রায় ঘণ্টা দুই ধরে মন্ত্রতন্ত্র পড়ে কালীগুণীন শেষে ভোলার মাথার চুলের ঝুঁটি ধরে নাড়িয়ে নাড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “এবার ভালয় ভালয় যাবি, না কালীগুণীনের হাতে চিরকালের মত মরবি?”
ভোলা ক্ষীণ স্বরে উত্তর দিল, “চলে যাব বাবা৷ তবে তোমাকে একটু এগিয়ে দিতে হবে৷ তালগাছের মাথায় মামদোগুলো নাহলে আমার দফারফা করে ছাড়বে৷”
কালীগুণীন আত্মতৃপ্তির হাসি হেসে বলল, “ঠিক আছে তাই এগিয়ে দেব, দেখি এই কালীগুণীন থাকতে কে তোর কী করে!”
তারপর ভোলার বাবাকে বলল, “নে গোবিন্দ, তোর ছেলের ভূত ছেড়ে গেছে৷ এবার আমার দক্ষিনাটা দিয়ে দে আমি যাই, ঘরে গুচ্ছের কাজ পড়ে রয়েছে৷”
গোবিন্দ টাকাটা দিতে কালীগুণীন ট্যাঁকে গুঁজে ভোলার চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে বেরিয়ে গেল৷ ভোলার মা আকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল, “ওকে কোথায় নিয়ে চললে কাকা?”
কালী তাকে আশ্বস্ত করে বলল, “ভেবো না বৌমা, ও এখুনি চলে আসবে৷”

(৩)

খানিকটা গিয়েই বিশ্বাসপুকুর৷ তেঁতুলগাছটার তলায় এসে কালীগুণীন ভোলার চুল ছেড়ে দিয়ে দাবড়ে বলে উঠল, “যা এবার নিজের জায়গায়, ভোলাকে ছাড়৷”
ছাড়া পেতেই ভোলা প্রথমে মাথাটায় একটু হাত বুলাল, চুলের গোড়াটা খুব জ্বালা করছে৷ তারপর চট করে ঘুরে কালীগুণীনের পিছনে গিয়ে তড়াক করে এক লাফ দিয়ে তার ঘাড়ে চড়ে ঝুলে পড়ল৷ বলে উঠল, “আমাকে কেউ ধরেনি দাদু—না ভূত না ব্রহ্মদত্যি৷ তোমার গুণিনী বিদ্যার দৌড় দেখছিলাম৷ বাবার কাছ থেকে যে টাকাগুলো ধাপ্পা দিয়ে ঝেড়ে নিয়ে এসেছ সব বের কর৷ নাহলে তোমার ঘাড় থেকে নামব না বলে দিলাম৷”
ব্যোমকেশও কোথায় লুকিয়েছিল কে জানে৷ সামনে এসে বলে উঠল, “একদম ছাড়িসনি ভোলা৷ খুব আমাদেরকে উল্টোপাল্টা কথা বলে, উপহাস করে। এবার তোমার গুণিনগিরির শ্রাদ্ধ করে ছাড়ব, সব্বাইকে ডেকে তোমার বুজরুকি ফাঁস করে দেব৷”
কালীগুণীন ভোলার ভারে হাঁসফাঁস করছিল৷ কাতর স্বরে বলতে লাগল, “ছাড় বাবা, লাগছে৷”
“আগে টাকাগুলো বের কর৷”
উপায়ান্তর না দেখে কালীগুণীন ট্যাঁক থেকে টাকা বের করতেই ভোলা তার পিঠ থেকে নেমে সামনে এসে খপ করে টাকাগুলো ছাড়িয়ে নিয়ে নিল৷
“সব টাকাগুলো নিয়ে নিবি? একদম দিবি না? আমার এত কষ্টের কোন দাম নেই?”
ভোলা তার থেকে শ’পাঁচেক তাকে ফেরৎ দিয়ে বলল, “যাও, এই নিয়ে মানে মানে কেটে পড়৷ নাহলে কিন্তু তোমার রক্ষে নেই৷”
ব্যোম বলে উঠল, “বেশী ট্যাঁ-ফোঁ করলে কিন্তু ওটাও পাবে না৷”
ঘাড়ে হাত বোলাতে বোলাতে কালীগুণীন ব্যোমভোলার দিকে চেয়ে বলল, “সবই তাহলে তোদের কারসাজি? আমাকে বোকা বানাবার মতলব?”
দু’জনে দাঁত বের করে হাসতে লাগল৷
“সত্যি মহা ধুরন্ধর তোরা, তোদের ক্ষুরে ক্ষুরে দণ্ডবৎ৷” বলে বেজার মুখে ধুতির কোঁচা ঠিক করতে করতে কালীগুণীন ঘরের পথ ধরল৷

Leave the first comment

এই ক্যাটাগরির আরও খবর