দুরন্ত প্রতিবেদন
শিলিগুড়ি, ৯ অক্টোবর
উড়ল কপ্টার। প্রাণ ফিরল উত্তর সিকিমে আটকে থাকা পর্যটকদের। বিগত ৫ দিন ধরে প্রায় ৩৬০০ পর্যটক ছিলেন দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন উপত্যকার বাসিন্দার মতন। তাঁরা আদৌ আর ঘরে ফিরতে পারবেন কিনা তা নিয়ে আতঙ্কের অন্ত ছিল না। অবশেষে সোমবার শ’য়ে শ’য়ে পর্যটক সেনার কপ্টারে চেপে লাচেন, লাচুং থেকে সিকিমের মঙ্গন হেলিপ্যাড ও পাকিয়ং গ্রিনফিল্ড বিমানবন্দরে পৌঁছলেন।
লোনক হ্রদ ফেটে উত্তর সিকিমে ভয়ঙ্কর ধ্বংসলীলার পর মুখ ভার ছিল প্রকৃতিরও। ফলে শত চেষ্টা করেও গোটা ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া লাচেন ও লাচুংয়ে হেলিকপ্টার পাঠাতে পারেনি সেনাবাহিনী। যে কারণে সেখানে আটকে থাকা পর্যটকদেরও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি ৫ দিন ধরে। বৃষ্টি ও ঘন কুয়াশা কেটে সোমবার ঝলমলে হয়েছে আকাশ। আর আবহাওয়া ঠিক হতেই সকাল থেকেই বীরবিক্রমে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েছে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ত্রিশক্তি অক্ষ। জেডপি-৫২০৭, এমআই ১৭ ও চিনুক নামের হেলিকপ্টার নিয়ে সেনা জওয়ানরা ক্রমাগত মঙ্গন থেকে লাচেন ও লাচুংয়ে যাতায়াত শুরু করে। আর হেলিকপ্টার ভরে ভরে নিয়ে আসা হয় পর্যটকদের। প্রথম দিকে বয়স্ক ও শিশুদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সেনার তরফে জানানো হয়েছে, ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত আকাশ পরিস্কার থাকবে বলে পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে। সেটা হলে কোনও সমস্যাই হবে না পর্যটকদের ফিরিয়ে আনা। এদিন লাচুং থেকে সেনাবাহিনী এমআই ১৭ ও চিনুক নামের হেলিকপ্টার ১০ বার ওঠানামা করে ৩৬৭ জন পর্যটককে নিয়ে আসতে পেরেছে। যার মধ্যে ১৩ জন বাংলাদেশী পর্যটক। এদের লাচুং থেকে পাকিয়ং গ্রিনফিল্ড বিমানবন্দরে নামানো হয়েছে। অন্যদিকে লাচেন থেকে সেনা হেলিকপ্টার জেডপি ৫২০৭তে করে মঙ্গনের রিঙ্গিম হেলিপ্যাডে দুপুর পর্যন্ত ৩ বারে ৪৫ জনকে নিয়ে আসা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকজন স্থানীয় মানুষও ছিলেন। পাশাপাশি হাঁটাপথে সেনার তৈরি বাঁশের সেতু ও লগ সেতু পার করে এদিন ৭০৬জন চুংথাম থেকে ফিরতে পেরেছেন। বিকেলের দিকে উদ্ধার করা পর্যটকের সঠিক সংখ্যা জানা সম্ভব হয়নি। তবে সেনার তরফে জানানো হয়েছে, উত্তর সিকিমের লাচেন, লাচুং, থাঙ্গু সহ কয়েকটি এলাকায় আটকে থাকা ৬৩ জন বিদেশী পর্যটক সহ মোট ২০০০ পর্যটকের একটি তালিকা তৈরি করা গেছে। যাদের এদিন আনা সম্ভব হয়নি তাঁদের খাদ্য, চিকিৎসা, বাসস্থান এবং টেলিফোন সংযোগের ক্ষেত্রে সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। একটি হেল্পলাইন তৈরি করা হয়েছে। এদিন সিকিম সরকারের তরফেই সমস্ত তথ্য জানানো হয়েছে। যে পর্যটকদের কপ্টারে ফিরিয়ে আনা হয়, তাঁরা সেনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। মঙ্গনের হেলিপ্যাড কিংবা পাকিয়ং বিমানবন্দরে নামার পর তাঁদের আনন্দের সীমা ছিল না। কেউ সেলফিতে মজেছিলেন, তো কেউ বিমানবন্দরে ঘুরপাক খাচ্ছিলেন আনন্দে। বাস্তবিকই এই ছবি পাহাড়ের ক্ষতগুলিকে আড়াল করে ফেলেছিল এদিন। হিমালয়ান হসপিটালিটি অ্যান্ড ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্কের সম্পাদক সম্রাট সান্যাল জানান,‘পর্যটকরা ফিরতে শুরু করেছেন এটাই স্বস্তির। তবে আমাদের হিসেবে সব মিলিয়ে আটকে পড়া পর্যটকের সংখ্যা ৩৬০০ এর কাছাকাছি। ফলে সকলকে উদ্ধার করা সময়সাপেক্ষ। আশা করছি সেই কদিন আবহাওয়া ভাল থাকবে।’ উদ্ধার করা পর্যটকদের গ্যাংটক পর্যন্ত পৌঁছানোর ব্যবস্থাও করে দিচ্ছে সিকিম সরকার। আশা করা যাচ্ছে মঙ্গলবার বিকেলের পর থেকে সেইসব পর্যটকরা নামতে শুরু করবেন। এদিকে এদিন সিকিমের মুখ্যসচিব ভি বি পাঠক রাজ্যের পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের জাতীয় সঙ্কট ব্যবস্থাপনা কমিটির সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করেছেন। সেখানেও তিনি পর্যটক উদ্ধারের সুখবর শেয়ার করেছেন। পাশাপাশি রাজ্যের পরিস্থিতি ফেরানোর বিষয়ে আলোচনা ও প্রস্তাব জানিয়েছেন। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রক থেকে আসা একটি প্রতিনিধি দলকে নিয়ে এদিন রাজ্য প্রতিনিধিরা বেশ কিছু দুর্গত এলাকাও পরিদর্শন করে। যাতে করে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আন্দাজ করা যায়।













